হলুদকে অনেক সময় মিরাক্কেল হার্ব বা অলৌকিক ভেষজ বলা হয়ে থাকে। হলুদ আমাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটা মসলা। প্রতিদিনের রান্নায় হলুদ না ব্যবহার করলে রান্না অসম্পূর্ণ থেকে যায় এবং সঠিক স্বাদ পাওয়া যায় না। কাঁচা হলুদের গুনাগুন ও উপকারিতা কারোরই অজানা নয়। বহু বছর ধরে বাঙালিরা নিয়মিত রান্নার পাশাপাশি ত্বকের যত্নে হলুদ ব্যবহার করছে। তবে শুধুমাত্র ত্বকের যত্ন বা রূপচর্চার কাজে নয়, এছাড়াও বিভিন্ন রোগের ঔষধ হিসেবে কাঁচা হলুদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা এর গুনাগুন অনেক বলে জানান।

কাঁচা হলুদে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার, পটাশিয়াম, ভিটামিন বি ৬, ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন সি থাকে ও কারকিউমিন নামক রাসায়নিক থাকে। যা বিভিন্ন রোগের হাত থেকে আমাদের বাঁচায়।

কাঁচা হলুদ খেলে যে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়ে ও খাবার ঠিকমতো হজম হয় তা আমাদের কারোরই অজানা নয়। এছাড়াও আরো অনেক ঔষধি গুণ রয়েছে কাঁচা হলুদের, জানতে অণুচ্ছেদটি শেষ পর্যন্ত পড়তে থাকুন।

Table of Contents

১. ঔষধি গুন সম্পন্ন বায়ো একটিভ উপাদান

কাঁচা হলুদে বিভিন্ন ধরনের বায়ো একটিভ উপাদান রয়েছে। যেমন – কারকিউমিন, অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি, এন্টিবায়োটিক, অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল। কাঁচা হলুদের ৩% কারকিউমিন থাকে যা দেহের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে এবং ইমিউনিটি বাড়ায়।

২. প্রাকৃতিক এন্টি ইনফ্লামেটরি হিসেবে কাজ করে

হলুদে থাকা কারকিউমিনের অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি গুণ বিভিন্ন পেশির টানজনিত রোগ, যেমন -অস্ট্রিও আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস প্রভৃতির প্রদাহ থেকে আমাদের মুক্তি দেয়। পেশীর তন্তুর ক্ষয় থেকেও কাঁচা হলুদ রক্ষা করে।

কাঁচা হলুদের এন্টিবায়োটিক ও অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল গুন বিভিন্ন ক্ষত তাড়াতাড়ি সারাতে সহায়তা করে এবং ক্ষত জায়গায় নতুন চামড়া জন্মাতেও সাহায্য করে। অপারেশনের পর ব্যথা কমাতে ও পোড়ার ক্ষত কমাতে কাঁচা হলুদ সাহায্য করে।

৩. শরীরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা বাড়ায়

কাঁচা হলুদে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে যা ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দি কাশি কমাতে সাহায্য করে। ইমিউনিটি বাড়ায় যা সর্দি কাশি থেকে আরাম দেয়।

৪. মস্তিষ্কে নিউরোট ট্রাফিক ফ্যাক্টর বৃদ্ধি করে

কাঁচা হলুদ মস্তিষ্কের নিউরো ট্রাফিক ফ্যাক্টর বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। কারকিউমিন ব্রেন হরমোনকে বৃদ্ধি করে। ব্রেন এর নতুন নিউরন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। (Gunnars, 2021)

৫. হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়

কাঁচা হলুদের থাকা কারকিউমিন আমাদের রক্তনালীকে উন্মুক্ত করে ও রক্ত চলাচলের বাধাকে দূর করে পরিশুদ্ধ করে। হার্টের ব্লক দূর করে, ফলে রক্তচাপ কমায়। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়।

৬. ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে

ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে কাঁচা হলুদের গুণ অপরিহার্য। একজন সুস্থ প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গোলমরিচের সাথে কাঁচা হলুদ খেলে ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধি বন্ধ হয়। ফলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত কাঁচা হলুদ খেলে ৫৬ রকম ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়।

স্তন ক্যান্সার সচেতনতা ও চিকিৎসা জানতে পড়ুন

৭. আলঝাইমার রোগের চিকিৎসায় উপকারী

প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে কাঁচা হলুদ খেলে আলঝাইমার রোগীদের রোগের ক্ষেত্রে অনেক উপকার পাওয়া যায়।

৮. আর্থ্রাইটিস রোগের উপশম

কাঁচা হলুদ হাড়ের ক্ষয় ও হাড়ের গঠনের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখে ও হাড়কে সুস্থ ও মজবুত রাখে। এক গবেষণায় দেখা গেছে ফিজিওথেরাপীর চেয়ে কাঁচা হলুদ হাড়ের জয়েন্টের আরামদায়ক মুভমেন্টে অনেক সাহায্য করে। মেনোপেজের সময় মহিলাদের যে হাড়ের ক্ষয় হয় তা থেকেও কাঁচা হলুদ রক্ষা করে।

৯. বিষন্নতা দূর করে

ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে যে সমস্ত খারাপ লাগা, বিষণ্নতা, ভীতিকর, স্মৃতি থাকে তা কমাতে কাঁচা হলুদ সাহায্য করে। এতে থাকা অ্যান্টিইনফ্লামেটরি গুণ স্ট্রেস, চাপ, উদ্বেগ থেকে মুক্তি দেয়।

১০. বার্ধক্য জনিত সমস্যা দূর করে

বার্ধক্য জনিত কারণে অনেকের হাত ও পায়ের হাড় ক্ষয় হতে থাকে এবং চলাফেরায় অসুবিধা হয়। নিয়মিত কাঁচা হলুদ খেলে হাড়ের জয়েন্ট মুভমেন্টে অনেক সাহায্য করে।

অন্যান্য ক্ষেত্রে কাঁচা হলুদের ব্যবহারঃ

এই দশটি উপকার ছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্রে কাঁচা হলুদ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সেগুলো হলো –

১. ত্বকের যত্নে

প্রাচীন যুগ থেকে ত্বকের যত্নে কাঁচা হলুদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দাগ, রিংকেল, সানবার্ন থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যতম উপাদান হচ্ছে কাঁচা হলুদ। কাঁচা হলুদের রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা বয়সের ছাপ থেকে রক্ষা করে। মুখের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে।

২. ওজন কমাতে ভুমিকা

বর্তমানে সবাই অনেক সচেতন দেহের ওজন নিয়ে। অতিরিক্ত ওজন কমাতে সবাই খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও কিছু কৌশল অবলম্বন করে। কাঁচা হলুদে রয়েছে অ্যান্টি ওবেসিটি গুন যা শরীরের মেদ জমতে বাঁধা দেয় এবং মেটাবলিজমের হার বাড়ায়। ফলে কাঁচা হলুদ শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে অন্যতম উপকারী উপাদান।

৩. খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে

কাঁচা হলুদের গ্যাস্ট্রো প্রটেক্টিভ কিছু গুণ থাকে যা খাবারকে হজম করতে সাহায্য করে। হজমের গোলমাল, গ্যাসের সমস্যার ক্ষেত্রে কাঁচা হলুদের গুরুত্ব অপরিসীম।

৪. খাদ্য সংক্রমণ

কাঁচা হলুদে অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান থাকে যা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ থেকে খাদ্যনালীকে বাঁচায়। আমরা রোজ যে খাবার খাই তাতে নানা ধরনের জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া থাকে। কাঁচা হলুদ এই ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে এবং আমাদের প্রদাহ থেকে মুক্তি দেয়।

৫. ডায়াবেটিসে কাঁচা হলুদের ভুমিকা

কাঁচা হলুদে কারকিউমিন ও অ্যান্টি ডায়াবেটিক এজেন্ট থাকে। যা রক্তের শর্করা মাত্রা কমায় এবং ইনসুলিন হরমোনের ক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। যাদের ডায়াবেটিসের মাত্রা অতিরিক্ত তারা নিয়মিত কাঁচা হলুদ খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

৬. হাড় জোড়া লাগাতে কাঁচা হলুদ

বহু প্রাচীন যুগ থেকে হাত পা মচকে গেলে চুন হলুদের ব্যবহার হয়ে আসছে। হলুদ হাড়ের টিস্যুকে রক্ষা করে ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতে সাহায্য করে। দুধের সাথে কাঁচা হলুদ মিশিয়ে একত্রে খেলে ব্যাথা এবং প্রদাহ কমায়।

৭. দাঁতের ক্ষয় রোধ করতে

কাঁচা হলুদ দাঁতের এনামেল আস্তরনকে রক্ষা করে। মাড়ি থেকে রক্ত পড়া এবং মুখের ভেতর ক্ষত নিরাময় করতে কাঁচা হলুদ সাহায্য করে।

৮. এলার্জিতে ভূমিকা

কাঁচা হলুদে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুন রয়েছে যা এলার্জি নিরাময়ে সাহায্য করে।

কাঁচা হলুদ খাওয়ার নিয়ম

সকালে ও রাতে দুই বেলা ২৫০ মিলিগ্রাম করে খাওয়া যেতে পারে। সকালে খালি পেটে কাঁচা হলুদ খেলে ভালো উপকার পাওয়া যায় এবং রাত ঘুমানোর আগে দুধের সাথে কাঁচা হলুদ মিশিয়ে খেতে পারেন।

যেসব রোগের ক্ষেত্রে কাঁচা হলুদ খাওয়া উচিত নয়

কিডনিতে পাথর থাকলে

যাদের কিডনিতে পাথর আছে তাদের কাঁচা হলুদ খাওয়া উচিত নয়। কাঁচা হলুদে থাকা রাসায়নিক অক্সালেট কিডনির পাথর বৃদ্ধি করে।

কেমোথেরাপি

ক্যান্সার রোগী যারা কেমোথেরাপি দিচ্ছে তাদের কাঁচা হলুদ খাওয়া উচিত নয়। কাঁচা হলুদ কেমোথেরাপি প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়।

রক্ত জমাট বাধার ওষুধ খেলে

কাঁচা হলুদ রক্তকে পাতলা করে। যেসব রোগীরা রক্ত পাতলা এবং তারা রক্ত জমাট বাধার জন্য নিয়মিত ঔষধ খাচ্ছে তাদের কাঁচা হলুদ খাওয়া উচিত নয়।

গর্ভবতী নারী ও স্তন্যদানকারী মা

রান্নায় যে হলুদ ব্যবহার করা হয় তা গর্ভাবস্থায় খাওয়া যেতে পারে। কারণ রান্নার ফলে হলুদের কারকিউমিনের মাত্রা কমে যায়। তবে যদি হলুদ সাপ্লিমেন্টের পরিমাণ বেশি খাওয়া হয় তবে কাঁচা হলুদ খাওয়া উচিত নয় কারণ এতে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি থাকতে পারে।

স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রে কাঁচা হলুদ খাওয়া উচিত নয়।

ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে

কাঁচা হলুদ শর্করার মাত্রা কমায়। তবে অতিরিক্ত কাঁচা হলুদ খেলে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত পরিমাণ কমে যাবে যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর।

এলার্জি রোগ

কাঁচা হলুদ এলার্জি রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। তবে কিছু কিছু মানুষের কাঁচা হলুদে এলার্জি থাকে। তাদের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কাঁচা হলুদ খাওয়া উচিত নয়।

কাঁচা হলুদের নিরাপদ মাত্রা

প্রতিদিন ৫০০ থেকে ২০০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হলুদ খাওয়া নিরাপদ। দৈনিক দুই থেকে আড়াই হাজার মিলিগ্রাম হলুদের গুড়া রান্নায় ব্যবহার করলে তা থেকে কারকিউমিন মিলবে ৬০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম এতে দেহের কোন অসুবিধা হয় না।

তবে হলুদ সাপ্লিমেন্ট খেতে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

References

Gunnars K. (2021, 7may). 10 Proven Health Benefits of Turmeric and Curcumin. Retrieved from healthline: https://www.healthline.com/nutrition/top-10-evidence-based-health-benefits-of-turmeric

Last Updated on March 5, 2023

Was this article helpful?
YesNo