ডেঙ্গু হলো ভাইরাস জনিত একটি রোগ যা নিরাময়ের জন্য কোনো এন্টি-ভাইরাল ওষুধ নেই। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ডেঙ্গু ভাইরাস প্রতিহত করার চেষ্টা করে এবং জ্বর নিরাময়ের জন্য প্যারাসিটামল সেবন করতে হয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলার গুরুত্ব অনেক বেশি। 

ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এমনভাবে খাবার নির্বাচন করতে হবে যেন তা শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করতে পারে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে তোলে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোগ মুক্তিতে সহায়তা করে। এই অনুচ্ছেদে ডেঙ্গু রোগীর খাবার তালিকা (গ্রহণীয় ও বর্জনীয় খাবার) বর্ণনা করা হয়েছে।

ডেঙ্গু রোগীর খাবার তালিকা

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে পুরোপুরি বিশ্রামে থাকতে হবে এবং ঘন ঘন খাবার খেতে হবে। একবারে বেশি পরিমাণ খাবার খাওয়ার রুচি থাকে না। তাই ঘন ঘন খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নিম্নলিখিত খাবারগুলো বেশি বেশি খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

তরল জাতীয় খাবার

ডেঙ্গু রোগীদের শরীরে পানির চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তাই ঘন‌ ঘন পিপাসা লাগে।‌ পিপাসা মেটানোর জন্য পানি পান করার পাশাপাশি তরল জাতীয় বিভিন্ন খাবার খেতে হবে। 

বিশেষ করে খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, শরবত, ভাতের মাড়, স্যুপ, ফলের জুস, দুধ ইত্যাদি খাওয়া বেশ উপকারী হবে। 

খাবার স্যালাইন দোকান থেকে সহজেই কিনতে পাওয়া যায় যা প্যাকেটের গায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ পানিতে গুলিয়ে খেতে হবে। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম পানিতে স্যালাইন গুলিয়ে খাওয়া হলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এছাড়াও একবার স্যালাইন গুলিয়ে ১২ ঘন্টার বেশি সময় সংরক্ষণ করা যাবে না। গরম পানিতে স্যালাইন গুলানো যাবে না। বরং নরমাল পানি ব্যবহার করতে হবে।

ডাবের পানি ডেঙ্গু রোগীদের জন্য দারুন একটি পথ্য, তবে ডাবের পানি ডেঙ্গু রোগের কোনো ওষুধ নয়। তাই সহজেই ডাব পাওয়া না গেলে ডাবের জন্য ব্যতিব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। ডেঙ্গু মৌসুমে ডাবের দাম খুব বেড়ে যায় এবং অনেকের জন্যই ডাব কেনা অসাধ্য (অত্যন্ত ব্যয়বহুল) হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় ডাবের পরিবর্তে খাবার স্যালাইন, বিভিন্ন ফলমূল, লেবুর শরবত, দুধ, স্যুপ ইত্যাদি খাওয়া‌নো যেতে পারে। 

ফলমূল ও শাকসবজি 

fruits

ফলমূল ও শাকসবজিতে প্রচুর পানি, ভিটামিন, মিনারেলস ও এন্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে যা ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অনেক উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে। ভিটামিন ও এন্টি-অক্সিডেন্ট শরীরের রোগ‌ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং পানি ও মিনারেলস শরীরের তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা করে।‌ 

কলা, পেঁপে, তরমুজ, আমড়া, পেয়ারা, কমলা, আপেল, আঙ্গুর, মাল্টা, জাম্বুরা, আনারস, ডালিম, খেজুর, কিসমিস ইত্যাদি খাওয়া উপকারী হবে। সবজি হিসেবে রয়েছে আলু, কাঁচা পেঁপে, কাঁচা কলা, মিষ্টি কুমড়া, মটরশুটি, ছোলা, শিম, মসুর ডাল, কচুশাক, বাঁধাকপি, ব্রকলি, পালংশাক, টমেটো, গাজর, শশা ইত্যাদি।

কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার

কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার দ্রুত হজম হয় এবং শরীরে ক্যালরি সরবরাহ করে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য শরীরের ক্যালরির চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত ভাত, রুটি, নুডুলস, বিস্কুট ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।

ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে। কারণ ডেঙ্গু হলে বিশ্রামে থাকতে হয়। আর বিশ্রামে থাকা অবস্থায় (পরিশ্রম/ব্যায়াম করা হয় না) বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খেলে রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

প্রোটিনের উৎস 

sourch of protien

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের অন্তর্ভুক্ত হলো মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত খাবার, মাংস, কলিজা, টফু, বাদাম, ডাল ইত্যাদি। (Zanin, 2023)

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখতে হবে এবং বিভিন্ন ধরনের মাছ খেতে হবে। মুরগির মাংস সবার জন্যই নিরাপদ খাবার হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। তবে গরুর মাংসের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়।

যাদের হার্টের রোগের ঝুঁকি রয়েছে তাদের জন্য দুগ্ধজাত খাবার, কলিজা ও গরুর মাংস কম খেতে হবে।

সবার জন্যই লো ফ্যাট মিল্ক, টক দই ও ইয়োগার্ট খাওয়া যাবে। বিশেষ করে টক দই ও ইয়োগার্ট হলো প্রোবায়োটিকস ফুড যা পেটের ভেতর বসবাসকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। 

ডেঙ্গু রোগীর যেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য কিছু কিছু খাবার খাওয়া যাবে না অথবা যতটা সম্ভব কম খেতে হবে। কারণ এই জাতীয় খাবারগুলো ডেঙ্গু রোগীদের জন্য অপকারিতা বয়ে আনতে পারে। 

  • অতিরিক্ত লবণ, তৈলাক্ত খাবার ও ফাস্টফুড বর্জন করতে হবে। (Narayana Health, 2023) 
  • কাঁচা সবজি খাওয়া যাবে না। অতিরিক্ত চা ও কফি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। 
  • কোমল পানীয়  পান করা যাবে না। মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে বর্জন করতে হবে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য গ্রীন টি পান করা উপকারী হবে। গ্রীন টি হলো সবচেয়ে কম ক্যাফেইন সমৃদ্ধ চা এবং এতে প্রচুর পরিমাণে এন্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। গ্রীন টিতে আদা, লেবুর রস, লবঙ্গ, পুদিনাপাতা, মধু ইত্যাদি যোগ করা হলে স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অনেক বেড়ে যায়। 

ডেঙ্গু রোগীদের রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পেঁপে পাতার রস খাওয়ার প্রচলন রয়েছে যা কোনো স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু খাবার নয়। উপরন্তু প্লাটিলেট বৃদ্ধির জন্য পেঁপে পাতার রস খাওয়ার ব্যাপারে তেমন কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা‌ নির্দেশনা নেই।‌ সুতরাং প্রচলিত এসব খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

শেষ কথা

ডেঙ্গু নিরাময়ের ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রচুর তরল খাবার (পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ, শরবত ইত্যাদি) খেতে হবে। সেই সাথে ভাত, রুটি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ইয়োগার্ট, ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম ইত্যাদি খাবারগুলো খেতে হবে। অতিরিক্ত লবণ, তৈলাক্ত খাবার, ফাস্টফুড, কাঁচা সবজি, অতিরিক্ত চা ও কফি, কোমল পানীয়, মদ্যপান ইত্যাদি বর্জন করতে হবে।

ডেঙ্গু হলো মশাবাহিত সংক্রামক রোগ। ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে সবসময় মশারীর ভেতর রাখতে হবে।‌ বিশেষ করে দিনের বেলায় ডেঙ্গু মশা কামড়ানোর প্রবণতা অনেক বেশি থাকে। 

Bibliography

Narayana Health. (2023, 10). Food Diet For Dengue Patients – What To Eat And What To Avoid. Retrieved from Narayana Health: https://www.narayanahealth.org/blog/food-diet-for-dengue-patients/amp/ 

Zanin, T. (2023, January). Food for Dengue Treatment: What to Eat, Avoid & Diet Plan. Retrieved from TUA SAUDE: https://www.tuasaude.com/en/foods-that-can-speed-up-recovery-from-dengue/

Last Updated on January 7, 2024