আমাশয় (Dysentery) খুব কমন একটি স্বাস্থ্য সমস্যা যা জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর সংক্রমণ) ঘটিত কারণে হয়ে থাকে। আমাশয় রোগের লক্ষণগুলো হলো ঘন ঘন মলত্যাগ এবং মলের সাথে রক্ত বা মিউকাস নিঃসরণ হয়। এছাড়াও পেট ব্যথা, জ্বর, বমি বমি ভাব ইত্যাদি লক্ষণ থাকে।‌

আমাশয় নিরাময়ের জন্য ওষুধ সেবনের পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে হবে। এই অনুচ্ছেদে আমাশয় রোগীর জন্য কি কি খাবার খাওয়া উপকারী হবে এবং কোন খাবারগুলো বর্জন করতে হবে সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা 

আমাশয় রোগীর ক্ষেত্রে ঘন ঘন মলত্যাগের ফলে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ (মিনারেলস) বেরিয়ে যায়। শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণের জন্য খাবার স্যালাইন খেতে হবে।‌ বিশেষ করে প্রতিবার মলত্যাগের পর স্যালাইন খেতে হবে।

খাবার স্যালাইন বাজারে সহজেই কিনতে পাওয়া যায় যা প্যাকেটের গায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী গুলিয়ে খেতে হবে। নির্দেশিত পরিমাণের চেয়ে কম বা বেশি পানিতে স্যালাইন গুলানো যাবে না এবং স্যালাইন গুলিয়ে ১২ ঘন্টার বেশি সময় রাখা যাবে না।

ডাবের পানি 

green coconut

স্যালাইনের পাশাপাশি কচি ডাবের পানি খাওয়া উপকারী হবে। ডাবের পানি শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করতে পারে। এছাড়াও ডাবের পানিতে মিনারেলস রয়েছে। ডাবের পানি খেতে বেশ সুস্বাদু হওয়ায় সব বয়সের রোগীদের জন্য একটি দারুন পথ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

ফলমূল

আমাশয়ের রোগীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফলমূল খাওয়া উপকারী হবে। বিশেষ করে পাকা কলা, পাকা পেপে, আপেল,‌ বেল, পেয়ারা ইত্যাদি। ফল সহজেই হজম হয় এবং শরীরে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে।

বেলের শরবত বানিয়ে খাওয়া সবচেয়ে বেশি উপকারী পারে। তবে রাস্তার পাশে কিনতে পাওয়া বেলের শরবত খাওয়া যাবে না। কারণ সেগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে তৈরি করা হয় কিনা সেই ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে।

ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য মিষ্টি জাতীয় ফলগুলো বেশি পরিমাণে খাওয়া যাবে না। অনেকের ধারণা ফলের মিষ্টি ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ফলে থাকা মিষ্টি সহ যেকোনো ধরনের মিষ্টিজাতীয় খাবার (মূলত সরল শর্করা) রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

ভাত ও রুটি 

সাদা ভাত ও রুটি হলো সহজপাচ্য কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার। অর্থাৎ সহজেই হজম হয় এবং শরীরে প্রচুর ক্যালরি সরবরাহ করে। এছাড়াও ভাত ও রুটির পাশাপাশি পাউরুটি বা বিস্কুট খাওয়া যেতে পারে।

আলু 

আমাশয়ের রোগীদের জন্য আলু (যে আলু মূলত রান্না করে খাওয়া হয়) সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া উপকারী হবে। আলু কার্বোহাইড্রেট জাতীয় একটি খাবার যা শরীরে ক্যালরি সরবরাহ করে। 

আরেক ধরনের আলু রয়েছে যাকে মিষ্টি আলু (Sweet potato) বলা হয়। আমাশয়ের রোগীদের জন্য মিষ্টি আলু খাওয়া যাবে। মিষ্টি আলু সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে খেতে হবে। এছাড়াও দীর্ঘমেয়াদী আমাশয়ের (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম) রোগীদের জন্য নিয়মিত খাদ্যতালিকায় মিষ্টি আলু রাখা উপকারী হবে। 

শাকসবজি 

শাকসবজি কম ক্যালোরিযুক্ত খাবার। তবে প্রচুর পানি, ভিটামিন ও মিনারেলস সমৃদ্ধ। আমাশয়ের রোগীর খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি রাখতে হবে। 

শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে রান্না করতে হবে। বিশেষ করে কাঁচা অবস্থায় (সালাদ হিসেবে) খাওয়ার জন্য যত্ন সহকারে ধুয়ে নিতে হবে।

কাঁচা পেয়াজ, ফুলকপি, বাধাকপি, ব্রকলি ইত্যাদি খাওয়া যাবে না। 

অন্যান্য

  • কাঁচা কলা সিদ্ধ করে খাওয়া যেতে পারে। 
  • বাদাম খুব স্বাস্থ্যকর একটি খাবার যা স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। 
  • স্বাস্থ্যকর উপায়ে স্যুপ বানিয়ে খাওয়া উপকারী হবে।‌ 

আমাশয় রোগীর যেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে

আমাশয় হলে সবধরনের খাবার খাওয়া যাবে না। বরং কিছু খাবার পরিহার করতে হয়। (Ranjan, 2016)

দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার

আমাশয় ও আইবিএস বা ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (পুরাতন আমাশয় নামে পরিচিত) রোগীদের জন্য দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার বর্জন করতে হবে। কারণ এই জাতীয় খাবার খেলে পেটের সমস্যা আরো বেড়ে যায়।

তবে ইয়োগার্ট (Yogurt) খাওয়া যেতে পারে। কারণ ইয়োগার্ট হলো প্রোবায়োটিকস সমৃদ্ধ একটি খাবার। যা পরিপাকতন্ত্রে বসবাসকারী শরীরের জন্য উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। 

ফাস্টফুড 

fast foods 1

ফাস্টফুড,‌ অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, চিনি, কেক, চিপস, কোমল পানীয় ইত্যাদি যতটা সম্ভব বর্জন করতে হবে।‌ কারণ এই জাতীয় খাবার আমাশয়ের রোগীদের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

চা ও কফি 

চা ও কফি খাওয়ার ফলে আমাশয়ের লক্ষণ আরো বেড়ে যেতে পারে। তাই চা ও কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এছাড়াও আমাশয়ের রোগীদের জন্য মদ্যপান করা যাবে না।

আমাশয় হলে করণীয়

আমাশয় হলে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয় যা নিচে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে। (Firdous, 2023)

  • স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে মলত্যাগের পর ও খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
  • ঘন ঘন পানি ও খাবার খেতে হবে। পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা যাবে না। বরং যতটা সম্ভব বিশ্রামে থাকতে হবে। 
  • বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ট্যাবের পানি ফুটিয়ে বা ফিল্টারের সাহায্যে বিশুদ্ধ করতে হবে।‌ 
  • নিয়ম মেনে এন্টি-বায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হবে। কোনো হার্বাল ওষুধ সেবন করা যাবে না।

শেষ কথা

আমাশয় স্বল্পমেয়াদী একটি রোগ যা এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। আমাশয় হলে নিয়মিত ওষুধ সেবন করার পাশাপাশি খাবার স্যালাইন খেতে হবে। এছাড়াও ডাবের পানি,‌ ফলমূল, শাকসবজি, ভাত, রুটি, স্যুপ, সিদ্ধ আলু, বাদাম ইত্যাদি খেতে হবে। ইয়োগার্ট খাওয়া উপকারী হবে। তবে দুধ, দুগ্ধজাত খাবার, ফাস্টফুড, চিপস, কোমল পানীয়, চা, কফি ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।

আমাশয় প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা আবশ্যক। বিশেষ করে মলত্যাগের পর ও খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। খাবার ঢেকে রাখতে হবে যেন খবারে মাছি বসতে না পারে। এছাড়াও সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য আমাশয় রোগীর সংস্পর্শ ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলত হবে।‌ 

Bibliography

Firdous, D. H. (2023, January 03). Diet Chart For dysentery. Retrieved from lybrate: https://www.lybrate.com/topic/diet-for-dysentery

Ranjan, D. R. (2016, May 17). Dysentery: Treatment, Diet and Home Remedies. Retrieved from mtatva: https://www.mtatva.com/en/disease/dysentery-treatment-diet-and-home-remedies/

Last Updated on January 7, 2024