নিউমোনিয়া হলো ফুসফুসের ইনফেকশন জনিত একটি রোগ যা সাধারণত ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে হতে দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সারা বিশ্বে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিশু (৫ বছরের কম বয়সী) নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। (WHO, 2022) 

নিউমোনিয়া প্রতিকার ও প্রতিরোধের কার্যকরী উপায় রয়েছে। এই অনুচ্ছেদে নিউমোনিয়ার কারণ, ধরন, লক্ষণ, কিভাবে নিউমোনিয়া নির্ণয় করা হয়,‌ নিউমোনিয়া চিকিৎসা পদ্ধতি এবং প্রতিরোধের জন্য করণীয় বিষয়াবলী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 

নিউমোনিয়া কি? (Pneumonia meaning in Bengali) 

নিউমোনিয়া (Pneumonia) একটি ইংরেজি শব্দ যার কোনো বাংলা প্রতিশব্দ নেই। অর্থাৎ বাংলাতেও এই রোগটিকে নিউমোনিয়া বলা হয়। তবে সহজভাবে ফুসফুসে জীবাণুর সংক্রমণ বলা যেতে পারে। 

জীবাণুর সংক্রমণের ফলে ফুসফুসের বায়ুথলিতে (অ্যালভিওলাই) প্রদাহের সৃষ্টি হয়। আর প্রদাহের ফলে বায়ুথলিতে পুঁজ বা তরল পদার্থ জমা হয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটা সহ নানাবিধ অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা যায়। এটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় নিউমোনিয়া বলা হয়।

নিউমোনিয়া রোগের আক্রমণ হঠাৎ করেই শুরু হয় এবং সময়ের সাথে সাথে তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে। তবে নিউমোনিয়া কোনো ক্রনিক ডিজিজ নয়। অর্থাৎ নিউমোনিয়ার স্থায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদী হয় না।

নিউমোনিয়া কেন হয় বা এর কারণ কী?

নিউমোনিয়া জীবাণু ঘটিত একটি রোগ। অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাংগাস বা অন্যান্য রোগজীবাণুর সংক্রমণের ফলে নিউমোনিয়া হয়ে থাকে। 

নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী সবচেয়ে কমন জীবাণুটির নাম হলো Streptococcus pneumoniae যা একটি ব্যাকটেরিয়া। এছাড়াও অন্যান্য যেসব ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ফাংগাস সংক্রমণের ফলে নিউমোনিয়া হয়ে থাকে তা হলোঃ (Normandin, 2023)

  • Haemophilus influenzae
  • Mycoplasma pneumoniae
  • Legionella pneumophila
  • Influenza (flu)
  • Rhinoviruses (common cold)
  • Respiratory syncytial virus (RSV) 
  • SARS-CoV-2 infection
  • Pneumocystis jirovecii
  • Cryptococcus species
  • Histoplasmosis species 

নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি কাদের?

যেকোনো বয়সের মানুষের ক্ষেত্রেই নিউমোনিয়া হতে পারে। তবে ছোট শিশু (২ বছরের কম বয়সী) এবং বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে (৬৫ বছরের বেশি বয়সী) নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যায়।

শিশু ও বৃদ্ধদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দূর্বল হওয়ায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়াও আরো যেসব ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে তা হলোঃ

  • ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি (সিওপিডি, অ্যাজমা, সিস্টিক ফাইব্রোসিস ইত্যাদি)
  • ক্যান্সার, এইডস, ডায়াবেটিস বা হার্টের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি 
  • স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবনের ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া 
  • যাদের ধুমপানের অভ্যাস রয়েছে এবং পরোক্ষ ধূমপানের প্রভাব 
  • গর্ভবতী নারী (গর্ভকালীন নিউমোনিয়াকে Maternal Pneumonia বলা হয়)

নিউমোনিয়া কি সংক্রামক?

সংক্রামক রোগ বলতে বোঝায় যেসব রোগ অসুস্থ ব্যক্তি থেকে সুস্থ ব্যক্তিদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে। নিউমোনিয়া একটি সংক্রামক রোগ। নিউমোনিয়ার জীবাণু অসুস্থ ব্যক্তির হাঁচি ও কাশি থেকে নির্গত ড্রপলেটের মাধ্যমে বায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ ড্রপলেটের মাধ্যমে সুস্থদের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

 

নিউমোনিয়া কত প্রকার?

types of pneumonia

জীবাণু সংক্রমনের ধরন অনুযায়ী নিউমোনিয়া প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে। যথাঃ ব্যাকটেরিয়া জনিত নিউমোনিয়া এবং ভাইরাস জনিত নিউমোনিয়া।‌ 

এছাড়াও ফাংগাস জনিত নিউমোনিয়া হতে পারে। তবে তা খুবই বিরল। ফাংগাস জনিত নিউমোনিয়ার বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সংক্রামক নয়। অর্থাৎ ড্রপলেটের মাধ্যমে ফাংগাস ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে না।

ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া জনিত নিউমোনিয়ার মধ্যে পার্থক্য কী? 

ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া জনিত নিউমোনিয়ার মধ্যে পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হয়েছেঃ (Cleveland Clinic, 2022)  

  • ব্যাকটেরিয়া জনিত নিউমোনিয়া তুলনামূলক বেশি হারে হতে দেখা যায় এবং লক্ষণের তীব্রতা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে এন্টি-বায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। 
  • ভাইরাস জনিত নিউমোনিয়ার আক্রমণ ও লক্ষণ কম হয়ে থাকে।‌ এক্ষেত্রে খুব বেশি জটিলতা হতে দেখা যায় না। সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, বরং রোগীকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করা সম্ভব হয়। 

নিউমোনিয়া রোগের লক্ষণ  

নিউমোনিয়ার কমন লক্ষণগুলো হলো শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, জ্বর, কাশি, কফ নির্গত হওয়া ইত্যাদি।‌ 

জীবাণুর ধরন এবং রোগীর বয়স ভেদে লক্ষণের তারতম্য হয়ে থাকে যা নিচে বর্ণনা করা হয়েছে।  

ব্যাকটেরিয়া জনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ 

  • জ্বর (তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট হতে পারে) 
  • ক্লান্তি বোধ
  • শ্বাসকষ্ট
  • বুকে‌ ব্যথা 
  • ঘাম হওয়া বা শীতবোধ
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া 

ভাইরাস জনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ 

ভাইরাস জনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ অনেকটা ব্যাকটেরিয়া জনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণের মতোই। তবে এক্ষেত্রে লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এবং তীব্রতা তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। এছাড়াও আনুষাঙ্গিক লক্ষণ হিসেবে শুষ্ক কাশি, মাথাব্যথা, মাংসপেশীতে ব্যথা, দুর্বলতা ইত্যাদি দেখা যায়।

ছোট বাচ্চাদের নিউমোনিয়ার লক্ষণ

ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে জ্বর, শ্বাসকষ্ট, কাশি সহ আরো যেসব লক্ষণ থাকে তা হলো অতিরিক্ত কান্না করা, খাওয়ার প্রতি অনীহা, বুকের মধ্যে শব্দ হওয়া, ত্বক ফ্যাকাশে বর্ণের হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।‌  

৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়ার লক্ষণ  

বয়স্কদের ক্ষেত্রে লক্ষণের তীব্রতা কম দেখা যায়। জ্বর, শ্বাসকষ্ট, কাশি ও কফ নির্গত হওয়া ছাড়াও আরো যেসব লক্ষণ থাকে তা হলো ক্ষুধা কমে যাওয়া, দুর্বলতা, ক্লান্তি বোধ, মানসিক অস্থিরতা ইত্যাদি। 

নিউমোনিয়া নির্ণয়ের জন্য কী কী পরীক্ষা করা হয়? 

লক্ষণ বিবেচনায় নিউমোনিয়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।‌ এছাড়াও চিকিৎসক স্টেথোস্কোপের সাহায্যে রোগীর বুকের পর্যবেক্ষণ করেন এবং কতিপয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।‌ যেমনঃ কফ পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, বুকের এক্সরে বা সিটিস্ক্যান ইত্যাদি।

নিউমোনিয়া রোগের চিকিৎসা  

pneumonia medication

ব্যাকটেরিয়া জনিত নিউমোনিয়া আক্রান্ত রোগীর প্রধান চিকিৎসা হলো চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী এন্টি-বায়োটিক ওষুধ সেবন করা। তবে ভাইরাস জনিত নিউমোনিয়ার জন্য এন্টি-বায়োটিক সেবন করা যাবে না। কারণ এন্টি-বায়োটিক ওষুধ ভাইরাস ধ্বংস করার ক্ষেত্রে কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে না। 

জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল (Paracetamol) জাতীয় ওষুধ সেবন করা লাগবে। তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীকে বিশ্রামে থাকতে হবে এবং স্বাভাবিক খাবার খেতে হবে।

শিশুদের ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করতে হবে। বড়দের জন্য তরল খাবার (পানি, শরবত, ফলমূল, শাকসবজি, স্যুপ ইত্যাদি) বেশি বেশি খেতে হবে। প্রয়োজনে শিরায় স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে।

নিউমোনিয়া রোগ প্রতিরোধে করণীয় 

নিউমোনিয়া প্রতিরোধে নিচে উল্লেখিত নিয়মগুলো মেনে চলার চেষ্টা করুন।

  • সময়মতো টিকা গ্রহণ করতে হবে। 
  • শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। 
  • ধুমপান বর্জন করা উচিত। ধুমপান শিশুর জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। 
  • হাঁচি ও কাশির সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।‌ অর্থাৎ হাত বা রুমাল দিয়ে মুখ ঢাকতে হবে। 
  • শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী রাখার জন্য পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।  
Bibliography

Cleveland Clinic. (2022, 11 15). Pneumonia. Retrieved from Cleveland Clinic: https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/4471-pneumonia

Normandin, B. (2023, February 08). Everything You Need to Know About Pneumonia. Retrieved from healthline: https://www.healthline.com/health/pneumonia

WHO. (2022, November 11). Pneumonia in children. Retrieved from WHO: https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/pneumonia

Last Updated on January 7, 2024