সুমিষ্ট, সুস্বাদু ও বেশ পরিচিত একটি ফলের নাম হচ্ছে খেজুর। বহু বছর ধরেই চলছে খেজুরের চাষ। প্রধানত মরুভূমি অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি জন্মায় এই খেজুর। বাংলাদেশে বিশেষ করে রমজান মাসে ইফতারের টেবিল যেন খেজুর ছাড়া একদমই অপূর্ণ। ধর্মীয় দিক তো আছে বটেই। এছাড়াও সারা দিনের রোজার শেষের যে ক্লান্তিভাব, তা কাটাতে বেশ কার্যকরী খেজুর। তবে শুধু রমজান মাসেই না, খেজুরের অগণিত পুষ্টিগুণ মানুষের স্বাস্থ্যের উপকারে লাগতে পারে বছর জুড়েই। রসালো ফল খেজুরের এমনই বিভিন্ন দিক নিয়েই হবে আজকের আলোচনা।

খেজুর খাওয়ার উপকারিতা

সাধারণত মধ্যপ্রাচ্য থেকে উৎপাদনের পর বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে যে খেজুর কিনতে পাওয়া যায়, তার সবই শুকানো খেজুর। বলা হয়ে থাকে, অন্তত দুইটি খেজুর প্রতিদিন খাওয়া গেলে দূরে থাকা যাবে বহু অসুখ থেকে। চলুন জেনে নেই, কী কী উপকারিতা পাওয়া যায় খেজুর খেলে।

১. প্রচুর পুষ্টিগুণ

খেজুরে উপস্থিত ভিটামিন বি ৬ ও ক্যারোটিনয়েড দৃষ্টি শক্তিকে ভালো রাখে। রাতকানা রোগ প্রতিরোধেও এরা কার্যকরী। খেজুরে আরো থাকা অন্যান্য ভিটামিন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, কপার, আয়রন ইত্যাদি উপাদান যা একজন মানুষের প্রতিদিনের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারে অনেকটাই। খেজুরে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড নামক এন্টি-অক্সিডেন্ট ঝুঁকি কমায় ডায়াবেটিস, আলঝেইমার ও ক্যান্সারের মতো রোগের।

২.ফাইবারে ভরপুর

একজন মানুষের সুস্বাস্থ্যের জন্য ফাইবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই উপকারী ফাইবারেই ভরপুর হচ্ছে খেজুর। নিয়মিত খেজুর খেলে পেট পরিস্কার থাকার পাশাপাশি দূর হয় কোষ্ঠকাঠিন্যও। ফাইবারের কারনে খেজুর খাওয়ার পর হজম হতে বেশ সময় নেয় বলে, অপ্রয়োজনীয় ক্ষুধাও লাগে না বারবার।

৩. মস্তিষ্ক ভালো রাখে

মস্তিষ্কের বিভিন্ন নিউরনজনিত রোগ, বিশেষ করে আলঝেইমারের ঝুঁকি কমাতে বিশেষভাবে উপকার করতে পারে খেজুরে উপস্থিত উপকারী খনিজগুলো। মস্তিষ্কের বিভিন্ন প্রদাহ কমায়। প্রখর করে তোলে স্মৃতিশক্তি। বেটা-এমাইলয়েড (Beta-Amyloid) নামক একটি উপাদান বেড়ে গিয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের ব্যাঘাত ঘটায়। এমনকি মস্তিষ্কের কোন কোন কোষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে মারাও যায়। যার ফলাফল হিসেবে হয় মস্তিষ্কের নানান কঠিন অসুখ। এই বেটা-এমাইলয়েড প্রতিরোধে কাজ করে খেজুরে থাকা উপকারী উপাদান।

৪. বাচ্চা প্রসব ত্বরান্বিত করে

খেজুরে থাকা উপাদান জরায়ুর পেশিকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। যার ফলে বাচ্চা প্রসব প্রক্রিয়া মসৃণ হয়। এতে বাচ্চা প্রসবে কম সময় লাগে । কৃত্রিমভাবে প্রসব বেদনা উঠানোর প্রয়োজনীয়তাও কমাতে পারে খেজুর।

৫. চিনির বিকল্প

ডায়াবেটিস রোগীরা যারা সাদা চিনি খান না, তারাও খেতে পারেন খেজুর। কারণ, খেজুরে থাকা মিষ্টি স্বাদের উৎস সুক্রোজ নয়, বরং ফ্রুক্টোজ। বিভিন্ন ধরণের ডেজার্ট ও মিষ্টিজাতীয় খাবারে চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় খেজুরের পেস্ট। প্রতি এক কাপ চিনির পরিবর্তে এক কাপ খেজুরের পেস্ট ব্যবহার করলে, সেই খাবারের স্বাদ কমবে না একদমই। বরং বাড়বে আরো বেশি

৬. হাড়ের সুরক্ষায়

অগণিত ভিটামিন ও খনিজের সাথে খেজুরে আরো থাকে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ও ম্যাগনেসিয়াম। এই সব উপাদানই মানুষের শরীরের হাড়ের গঠন ও সুরক্ষার জন্য পরিচিত। বিশেষ করে হার ক্ষয়জনিত অসুখ অস্টিওপরোসিস ও অস্টিওআর্থ্রাইটিস প্রতিরোধে বিশেষ ভাবে কার্যকরী খেজুরে উপস্থিত বিভিন্ন উপাদান।

৭. লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স

খেজুর একটি লো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সম্পন্ন ফল। সহজ কথায় বললে “গ্লাইসেমিক ইনডেক্স” যেসব খাবারে বেশি থাকে, সেসব খাবারে উপস্থিত গ্লুকোজ দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং ব্লাড সুগারের মাত্রা হঠাত বাড়িয়ে দেয়। আর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম থাকলে সেই খাবার ব্লাড সুগারের মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে না। ধীরে ধীরে শরীরে শোষণ হওয়ার কারনে খেজুরে থাকা কার্বও গ্লুকোজে পরিণত হয়ে ব্লাড সুগার বাড়িয়ে দেয় না। এতে স্বাভাবিক থাকতে পারে ব্লাড সুগারের মাত্রা।

৮. উচ্চরক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে

ধমনী দিয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ গতিতে রক্ত প্রবাহিত হলে, তাকে বলা হয় উচ্চ রক্তচাপ। এতে আর্টারির দেয়ালে চাপ পরে হতে পারে হৃদরোগ, স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী রোগ। খেজুরে থাকা উচ্চ মাত্রার ম্যাগনেসিয়াম মানুষের শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে বিশেষভাবে। আশঙ্কা কমে হৃদযন্ত্র ও ধমনির মারাত্মক সব অসুখের। এমনকি রক্তস্বল্পতায় ভোগা মানুষদেরও শরীরে রক্ত বাড়াতে সাহায্য করে খেজুর।

খেজুর খাওয়ার নিয়ম

সাধারনত আমাদের দেশে খেজুর খাওয়ার সবচেয়ে পরিচিত পদ্ধতি হচ্ছে, আস্ত শুকনো খেজুর বিচি ফেলে খেয়ে নেয়া। তবে সবসময় একইভাবে খেতে একঘেয়ে লাগলে খেজুর খেতে পারেন কিছু ভিন্ন পদ্ধতিতেও। এতে স্বাদের পরিবর্তনের পাশাপাশি মিটবে পুষ্টির চাহিদাও।

খেজুরের কেক:

যেখানে কেকের সব উপাদান অক্ষুণ্ণ রেখে, শুধুমাত্র চিনির স্থানে ব্যবহার করবেন খেজুরের পেস্ট। খেজুর ভিজিয়ে রেখে ব্লেন্ডারে পেস্ট তৈরি করে নিলে, এটি খুব সহজেই মিশে যাবে কেকের মিশ্রনে। খেজুরের মিষ্টতায় বাড়বে কেকের স্বাদ, চিনির অনুপস্থিতিতে কমবে ক্যালোরি!

খেজুরের স্মুদি বা মিল্কশেক:

যারা বিভিন্ন ঠাণ্ডা পানীয়, মিল্কশেক ইত্যাদি খেতে পছন্দ করেন, তারা ঘরেই বানাতে পারেন খেজুরের স্মুদি বা মিল্কশেক। ভিজিয়ে রাখা বিচি ছাড়া খেজুর পরিমাণমতো দুধের সাথে ব্লেন্ড করলেই তৈরি হয়ে যাবে খেজুরের মিল্কশেক। চাইলে এর সাথে অন্য কোন ফল বা ফ্লেভারও যোগ করতে পারবেন নিজের স্বাদ অনুযায়ী।

সালাদঃ

নানারকমের মৌসুমি ফলের মিক্সড ফ্রুট সালাদে যোগ করতে পারেন ছোট করে কেটে নেয়া খেজুরের টুকরো।

  • অনেকেই তাৎক্ষনিক শক্তির জোগান দেয়ার জন্য নানারকম ড্রাই ফ্রুটস, বাদাম বা ওটসের বার বানিয়ে বা কিনে সাথে রাখেন। এই বার ঘরে বানাতে ব্যবহার করতে পারেন খেজুর। যেখানে ইচ্ছেমতো ড্রাই ফ্রুটস, বাদাম, ওটস, সিডস ইত্যাদির সাথে ব্যবহার করতে পারেন খেজুরের ছোট ছোট টুকরো অথবা পেস্ট।
  • স্বাস্থসচেতন অনেকেই ওট্মিল খান সকালে। যেখানে ওটসের সাথে দুধ বা দই, পছন্দমতো ফল বা ড্রাই ফ্রুটস মিশিয়ে সারারাত রেখে দিয়ে সকালে খাওয়া হয়। সেই মিশ্রনেও যোগ করতে পারেন খেজুরকে।

গর্ভাবস্থায় খেজুর খেলে কী হয়?

গর্ভবতী মায়েদের খাবার তালিকায় খেজুর একটি অতি স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাদ্য উপাদান। নানাদিকেই একজন গর্ভবতী মা ও তাঁর গর্ভের শিশুর উপকারে আসতে পারে খেজুর।

  • গর্ভাবস্থায় অনেক মায়েদেরই কোষ্ঠকাঠিন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা যায়। এসময় কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীকরণে প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে খেজুর।
  • একজন গর্ভবতী নারীর শরীরে আরেকটি মানুষ বাড়তে থাকার কারনে আয়রন ও ক্যালসিয়ামের চাহিদা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায়। এই বাড়ন্ত চাহিদা পূরণে সাহায্য করে আয়রন ও ক্যালসিয়ামে ভরপুর খেজুর।
  • গর্ভাবস্থায় অনেক নারীরই রক্তচাপ বেড়ে যায়। অস্বাভাবিক উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি কিডনিতেও চাপ সৃষ্টি করে। গর্ভবতীদের এই উচ্চ রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে খেজুরে থাকা ম্যাগনেসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ।
  • খেজুরের মাধ্যমে শরীরে নানারকমের ভিটামিন, খনিজ ও এন্টি-অক্সিডেন্ট সরবরাহ হয়। যা গর্ভের শিশুর দাঁত, হাড় ও অন্যান্য অঙ্গের সুস্থ বিকাশে ভূমিকা রাখে। বৃদ্ধি পায় মা ও শিশু উভয়েরই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।
  • খেজুরের পুষ্টিগুণ জরায়ুর পেশিকে শক্তিশালী করে তোলে বলে, প্রসব পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তপাতের ঝুঁকি কমে যায় অনেকখানি।

খেজুর বেশি খেলে কী হয়?

অত্যাধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন যেকোন খাবারেরও থাকতে পারে কিছু ক্ষতিকর দিক। খেজুরেরও রয়েছে এমন কিছু বিষয়, যেগুলো নিয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

  • ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় খেজুর রাখার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
  • ইরিটেবল বাউয়েল সিন্ড্রোম (IBS-irritable bowel syndrome) বা পেটের হজমজনিত সমস্যায় যারা ভুগছেন, খেজুর খাওয়া তাদের উচিত নয়। খেজুরের উচ্চ মাত্রার ফ্রুক্টোজ ও ফাইবার পেটে গ্যাস সৃষ্টি করে হজমের সমস্যা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • যেহেতু খেজুর এমনিতেই হজম হতে বেশি সময় নেয়। তাই ভারী খাবার খাওয়ার পরই খেজুর খাওয়া উচিত নয়। এতে পেট অত্যাধিক ভরে গিয়ে অস্বস্তি বোধ হতে পারে।
  • যাদের শরীরে এমনিতেই পটাশিয়াম বেশি, কিংবা স্বাস্থ্যগত কোন কারনে ডাক্তারের নিষেধ আছে বাড়তি পটাশিয়াম যুক্ত খাবার খাওয়ায়, তাদের খেজুর না খাওয়াই ভালো।
  • যেহেতু খেজুরের ফাইবার এমনিতেই পায়খানা নরম রাখতে সাহায্য করে, তাই ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হলে খেজুর কম খাওয়াই ভালো।
  • যাদের খেজুরে এলার্জি আছে, তারাও এড়িয়ে চলবেন খেজুর। (Richter, 2020)

পুষ্টিগুণে পরিপূর্ণ একটি ফল এই খেজুর। আশা করি আপনিও প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় খেজুরের যথার্থ ব্যবহার করে হরেক রকম অসুস্থতা থেকে দূরে রাখতে পারবেন নিজেকে ও নিজের পরিবারকে। তবে মনে রাখতে হবে, খেজুরের ব্যবহার যেন হয় স্বাভাবিক মাত্রায়, সচেতনতার সাথে। অন্যথায় হতে পারে হিতে বিপরীত।

References

Richter A. (2022, October 13) 8 Proven Health Benefits of Dates, Retrieved from Healthline: https://www.healthline.com/nutrition/benefits-of-dates

Richter A. (2020, September 9) Is There a Best Time to Eat Dates? Retrieved from Healthline: https://www.healthline.com/nutrition/best-time-to-eat-dates

 

Last Updated on April 12, 2023