হরমোন (Hormones) হলো একধরনের রাসায়নিক উপাদান যা মানুষের শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় এবং রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ কাজে অবদান রাখে। যেমনঃ খাবার হজম করা, মেটাবলিসম, কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা, শরীরের সঠিক বৃদ্ধি, ঘুম, যৌন স্বাস্থ্য, সন্তান জন্মদান, মানসিক সুস্থতা ইত্যাদি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মানব দেহে ৫০ এর অধিক হরমোনের উপস্থিতি আবিস্কার করেছেন যা এন্ডোক্রাইন সিস্টেম (Endocrine system) নামে অভিহিত করা হয়। (cleveland clinic, 2022)

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকা জরুরী। কোনো কারণ বশত এন্ডোক্রাইন‌ সিস্টেমে সমস্যা তথা হরমোনের ভারসাম্যহীনতা হলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যঘাত ঘটে। এই অনুচ্ছেদে হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণ, লক্ষণ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। 

হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বলতে কি বুঝায়? 

শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে নির্দিষ্ট মাত্রায় হরমোন উৎপন্ন হয় এবং রক্তের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে দূরবর্তী স্থানের টিস্যু অথবা অঙ্গের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মানুষের শরীরে যেসব গ্রন্থি থেকে হরমোন নিঃসৃত হয়ে থাকে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি, থাইরয়েড, প্যারাথাইরয়েড, অ্যাড্রেনাল গ্ল্যান্ড, ওভারি, টেস্টিস, প্যানক্রিয়াস ইত্যাদি। যখন কোনো গ্রন্থি থেকে নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে কম অথবা বেশি হরমোন নিঃসৃত হয় তখন শরীরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ঘটে। 

স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে তুলনামূলক কম হরমোন নিঃসৃত হলে তাকে হাইপো (Hypo) এবং বেশি হরমোন নিঃসৃত হলে হাইপার (Hyper) টার্ম দ্বারা প্রকাশ করা হয়। যেমনঃ থাইরয়েড গ্রন্থি‌ থেকে অতিরিক্ত হরমোন নিঃসৃত হলে হাইপারথাইরয়েডিজম এবং কম হলে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। 

হরমোনের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ কি?

হরমোনের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ নির্ভর করে শরীরের কোন গ্রন্থি সঠিকভাবে কাজ করছে না তথা কোন হরমোনের কম বেশি হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে।‌ খাবার গ্রহণ থেকে শুরু করে হজম ও মেটাবলিসমের মাধ্যমে শক্তিতে রূপান্তর হওয়ার প্রক্রিয়ার সাথে অনেক গুলো হরমোনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই হরমোনের ভারসাম্যহীনতার ফলে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তা হলোঃ

  • দুর্বলতা ও ক্লান্তি বোধ
  • অস্বাভাবিক ভাবে ওজন বেড়ে যাওয়া অথবা ওজন কমতে থাকে
  • কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা ডায়রিয়া
  • তৃষ্ণা ও ঘন‌ ঘন প্রস্রাবের বেগ হয়
  • কোলেস্টেরলের ভারসাম্যহীনতা

এছাড়াও অ্যাডরেনাল গ্ল্যান্ড থেকে সঠিক মাত্রায় কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ না হলে মেটাবলিসমের সমস্যা সহ অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড প্রেসার, হার্টের অস্বাভাবিক স্পন্দন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, ত্বকে কালো দাগ, চুল পড়া, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।

মহিলাদের মধ্যে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা (AFAB) 

মহিলাদের (AFAB- assigned female at birth) শরীরের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গঠন পুরুষদের তুলনায় আলাদা হয়ে থাকে।

মহিলাদের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন হলো ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন যা ওভারি থেকে নিঃসৃত হয় এবং প্রজনন সম্পর্কিত বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে‌।

এছাড়াও ওভারি থেকে সামান্য পরিমাণ টেস্টোটেরন নিঃসৃত হয় যা পুরুষের হরমোন নামে পরিচিত। মহিলাদের শরীরের হরমোন স্বাভাবিকের চেয়ে কম অথবা বেশি মাত্রায় নিঃসৃত হলে নানাবিধ সমস্যা দেখা যায়। যেমনঃ 

  • ব্রণ হওয়ার প্রবণতা 
  • অতিরিক্ত চুল পড়ে যাওয়া
  • শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া
  • অনিয়মিত পিরিয়ড হওয়া
  • পিরিয়ডের সময় বেশি রক্তক্ষরণ 
  • শরীরে জ্বালাপোড়া (Hot flashes)
  • শরীরের বিভিন্ন স্থানে লোম গজায়
  • বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
  • যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া
  • যৌনাঙ্গের শুষ্কতা ইত্যাদি   

পুরুষদের মধ্যে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা (AMAB)  

পুরুষদের (AMAB- assigned male at birth) শরীরের প্রধান যৌন হরমোন হলো টেস্টোস্টেরন যা টেস্টিসে উৎপন্ন হয়। এই হরমোনের প্রধান কাজ হলো হাড় ও পেশির গঠন, যৌন স্বাস্থ্য এবং শুক্রাণু উৎপাদন করা।‌

এছাড়াও পুরুষদের শরীরে সামান্য পরিমাণে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন তৈরি হয়। শরীরে এই হরমোনের সঠিক ভারসাম্য বজায় না থাকলে যেসব সমস্যা হতে পারে হলোঃ 

  • লিঙ্গ উত্থানে সমস্যা বা ইরেকটাইল ডিসফাংশন (ED) 
  • শরীরে পর্যাপ্ত লোম গজায় না 
  • মাথার চুল পড়ে যায় 
  • স্তন বড় হওয়া (Gynecomastia)
  • বন্ধ্যাত্ব (Infertility)
  • যৌন ইচ্ছা কমে যায় 
  • মাংসপেশি কমে যায় ইত্যাদি

শিশুদের মধ্যে লক্ষণ বা উপসর্গ 

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন হলো গ্রোথ হরমোন যা শরীরের সঠিক গঠন ও বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত। পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে সঠিক মাত্রায় গ্রোথ হরমোন নিঃসৃত না হলে বাচ্চার শারীরিক গঠন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়াও বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আরো যেসব হরমোনের সমস্যা হতে পারে তা হলোঃ  

  • থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে অস্বাভাবিক পরিমাণে হরমোন নিঃসরণের ফলে শরীরের ওজন বেড়ে যেতে পারে
  • অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে কর্টিসল হরমোন নিঃসৃত হলে শরীরের স্বাভাবিক গঠন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, ওজন বেড়ে যায় এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়

বাচ্চাদের শরীরে যখন থেকে যৌন হরমোন নিঃসৃত হওয়া শুরু হয় সেই সময়টাকে বয়ঃসন্ধিকাল বলা হয়। ছেলে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ৯ থেকে ১৪ এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১৩ বছর বয়সে বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয়। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হলে তাকে precocious puberty বলা হয়। আবার Hypogonadism এর ফলে নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয় না। এক্ষেত্রে লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়- (Osborn, 2023)

  • গলার স্বরের পরিবর্তন হয় না
  • ছেলেদের ক্ষেত্রে শরীরের পেশী, অন্ডকোষ ও লিঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়
  • ছেলেদের স্তন বড় হয়ে যাওয়া
  • মেয়েদের ক্ষেত্রে পিরিয়ড না হওয়া
  • স্তনের স্বাভাবিক গঠন ব্যাহত হয়  

হরমোনের ভারসাম্যহীনতার কারণ 

নানাবিধ কারণে শরীরে হরমোন নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যায় অথবা কমে যেতে পারে যার মধ্যে কিছু বিষয় স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে থাকে। যেমনঃ বয়ঃসন্ধিকাল, বয়স বেড়ে যাওয়া, গর্ভাবস্থা, বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করানো এবং মেনোপজের সময়। এছাড়াও অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবন যাপন, কতিপয় ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, স্টেরয়েড গ্রহণ সহ আরো যেসব কারণে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে তা হলোঃ 

  • সার্জারি অথবা অন্য কোনো ভাবে গ্রন্থিতে আঘাত লাগা 
  • গ্রন্থিতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি মাত্রায় রক্ত সঞ্চালন হওয়া 
  • ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
  • রেডিয়েশন থেরাপির প্রভাব 
  • ওভারিতে সিস্ট হওয়া (PCOS- polycystic ovary syndrome)
  • অন্ডকোষে টিউমার 
  • Pituitary adenomas
  • Adrenal adenomas
  • Parathyroid adenomas
  • Thyroid nodules 
  • Hashimoto’s disease
  • Graves’ disease
  • Addison’s disease 

পরীক্ষা এবং রোগ নির্ণয়

শরীরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ দেখা গেলে তার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করার জন্য ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী কতিপয় পরীক্ষা করে দেখতে হবে। হরমোন জনিত সমস্যার ক্ষেত্রে সাধারণত নিম্নলিখিত টেস্ট করার প্রয়োজন হয়ে থাকে। যেমনঃ 

  • ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন 
  • TSH, T4 
  • S. testosterone 
  • FSH, LH 
  • S. cortisol
  • Glucose tolerance test
  • আল্ট্রাসনোগ্রাফি
  • বায়োপসি (Biopsy)
  • এক্সরে (X-ray)
  • এমআরআই (MRI) 

হরমোনের ভারসাম্যহীনতার চিকিৎসা 

হরমোনের ভারসাম্যহীনতার জন্য একজন হরমোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট) শরণাপন্ন হতে হবে। রোগের কারণ অনুযায়ী চিকিৎসার ধরন ভিন্নতর হয়ে থাকে অর্থাৎ যদি আপনার শরীরে স্বাভাবিকের তুলনায় কম পরিমাণে হরমোন নিঃসরণ হয় তবে হরমোন থেরাপি গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। যেমনঃ হাইপোথাইরয়েডিজমের রোগীদের জন্য থাইরয়েড হরমোন সাপ্লিমেন্ট, মেনোপজের সময়ে মহিলাদের জন্য সামান্য পরিমাণে ইস্ট্রোজেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা ইত্যাদি। আবার কারো শরীরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মাত্রায় হরমোন নিঃসরণ হলে তাদের জন্য বিভিন্ন ঔষধ সেবন, সার্জারি অথবা রেডিয়েশন থেরাপি গ্রহণের প্রয়োজন হয়। এছাড়াও কতিপয় নিয়ম মেনে চলা শরীরে হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমনঃ 

  • শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস
  • নিয়মিত ব্যায়াম করা 
  • মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ রাখা 
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো 
  • ধুমপান ও মদ্যপান বর্জন করা 
References

cleveland clinic. (2022, April 04). hormonal-imbalance. Retrieved from cleveland clinic: https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/22673-hormonal-imbalance

Osborn, C. O. (2023, February 09). Everything You Should Know About Hormonal Imbalance. Retrieved from healthline: https://www.healthline.com/health/hormonal-imbalance

Last Updated on November 29, 2023