সুর্যমূখী বীজ থেকে তেল (Sunflower oil) উৎপাদন করা হয় যা কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ ও সহজলভ্য আর তাই রান্নার কাজে ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়। তবে সূর্যমুখী বীজ খাওয়ার ব্যাপারটির সাথে অনেকেই হয়তো পরিচিত নয়।
সূর্যমুখী বীজ মজাদার দারুন একটি খাবার যা শরীরের জন্য বিভিন্ন উপকারিতা বয়ে আনতে পারে। শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সূর্যমুখী বীজ খাওয়া হলে কতটা উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে সেই বিষয়ে এই অনুচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
Table of Contents
সূর্যমুখী বীজ
সূর্যমুখীর বৈজ্ঞানিক নাম হলো Helianthus annuus যা আমাদের দেশে বর্তমানে চাষ করা হয়। এই গাছের ফুল অনেকটা সূর্যের মতো দেখতে এবং সূর্যের দিকেই মুখ করে থাকে বলে এমন নামকরণ করা হয়েছে।
সূর্যমুখী ফুল থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয় যা মাড়াই করার মাধ্যমে তেল বের করা হয়। এছাড়াও সূর্যমুখী বীজ সরাসরি স্ন্যাকস হিসেবে বা বিভিন্ন খাবারের সাথে (সালাদ, ইয়োগার্ট ইত্যাদি) যোগ করে খাওয়া যায়।
সুপার শপ ও অনলাইন শপে সূর্যমুখী বীজ কিনতে পাওয়া যায়।
পুষ্টিগুণ
সূর্যমুখী বীজ থেকে প্রোটিন, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট পাওয়া যায়। ১ আউন্স (২৮ গ্রাম পরিমাণ) সূর্যমুখী বীজের পুষ্টিগুণ নিচে উল্লেখ করা হলো। (Meixner, 2020)
- ১৬৫ ক্যালরি
- ১৪ গ্রাম ফ্যাট
- ৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট
- ৩ গ্রাম ফাইবার
- ৫.৫ গ্রাম প্রোটিন
এছাড়াও সূর্যমুখী বীজ শরীরের ভিটামিন ই ও সেলেনিয়ামের দৈনিক চাহিদার যথাক্রমে ৪৯ শতাংশ ও ৪১ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। সেই সাথে অন্যান্য ভিটামিন ও মিনারেলস খুব অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়।
ওজন কমাতে সাহায্য করে
শরীরের ওজন কমাতে সূর্যমুখী বীজ কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে এই বিষয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। তবে সূর্যমুখী বীজ শরীরের ওজন কমানোর ক্ষেত্রে ব্যবহারের কিছু যুক্তি রয়েছে।
স্ন্যাকস হিসেবে সূর্যমুখী বীজ খাওয়া হলে তা ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানোর জন্য দৈনিক ক্যালরি চাহিদার তুলনায় কিছুটা কম পরিমাণে খাবার খাওয়া উচিত এবং সেই সাথে নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরী।
কম পরিমাণে খাবার খাওয়া এবং ব্যায়াম করার ফলে ঘন ঘন ক্ষুধার অনুভূতি হয়। ক্ষুধা পেলে খাবার (বিশেষ করে ফাস্টফুড) না খেয়ে সূর্যমুখী বীজের মতো স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস গ্রহণ করলে দীর্ঘসময় পর্যন্ত পেট ভরা থাকবে। সূর্যমুখী বীজ প্রোটিন, ফ্যাট ও ফাইবার সমৃদ্ধ যা ধীর গতিতে হজম হয়।
পেশীতে শক্তি বৃদ্ধি করে
শরীরের ওজন কমানোর ক্ষেত্রে মাংসপেশী যেন ক্ষয় না হয় সেজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন জাতীয় খাবার খেতে হবে। মাছ, মাংস, ডিম, ফ্যাট ফ্রি দুধ, ডাল ইত্যাদি প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখতে হবে। তবে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার (ভাত ও রুটি) কম খেতে হবে।
সূর্যমুখী বীজে শর্করার পরিমাণ খুব কম তবে বেশ ভালো পরিমাণে প্রোটিন রয়েছে। শরীরের ওজন কমানোর জন্য সূর্যমুখী বীজ খাওয়া হলে মাংসপেশী দূর্বল হবে না বরং পেশীতে শক্তি বৃদ্ধি পাবে।
ওজন কমানোর জন্য ব্যায়াম করার পর সূর্যমুখী বীজ খাওয়া উপকারী হবে।
স্বাস্থ্য উপকারিতা
শরীরের ওজন কমানো ছাড়াও সূর্যমুখী বীজ খাওয়ার ফলে আরো যেসব স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়া যায় তা নিচে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো। (Garg, 2023)
- সূর্যমুখী বীজ স্বাস্থ্যকর ফ্যাট সমৃদ্ধ একটি খাবার যা রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায়।
- সূর্যমুখী বীজ ভিটামিন, মিনারেলস ও এন্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
- এন্টি-অক্সিডেন্ট গুণাবলীর জন্য বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে যার মধ্যে অন্যতম হলো স্তন ক্যান্সার।
- ভিটামিন ই সমৃদ্ধ যা ত্বক ও চুলের যত্নে বেশ উপকারী ভূমিকা রাখে।
- প্রদাহ নাশক গুণাবলী রয়েছে যা বাতব্যথা ও মহিলাদের পিরিয়ডের যন্ত্রণা কমাতে সাহায্য করে।
সূর্যমুখী বীজ একটি লো-গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ফুড যা রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় না। অর্থাৎ ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের জন্য একদম নিশ্চিন্তে সূর্যমুখী বীজ খাওয়া যাবে।
খাদ্য পরিকল্পনা
খাবারের তালিকায় শুধু সূর্যমুখী বীজ যোগ করলেই ওজন কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে না। বরং সঠিক খাদ্য পরিকল্পনা মেনে চলা জরুরী। যেমনঃ
- প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। যেমনঃ বাদামী চালের ভাত, লাল আটার রুটি, ওটস, যব, ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি।
- চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
- কোমল পানীয় পান করার অভ্যাস বর্জন করতে হবে।
- চর্বিযুক্ত মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, পোড়া তেলে ভাজা খাবার ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।
- পর্যাপ্ত পরিমাণে (দিনে ২ থেকে ৩ লিটার) পানি পান করতে হবে।
- চা, কফি খাওয়া যাবে তবে সীমিত মাত্রায় এবং চিনি ছাড়া খেতে হবে।
শরীরের ওজন, বয়স, রোগ ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে ওজন কমানোর খাদ্য তালিকা ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। খাবার সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা (ডায়েট প্ল্যান) পেতে একজন পুষ্টিবিদের শরণাপন্ন হতে হবে।
সূর্যমুখী বীজ খাওয়ার নিয়ম
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক ১ আউন্সের (২৮ গ্রাম) বেশি সূর্যমুখী বীজ খাওয়া উচিত হবে না। কারণ অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে পেট ব্যথা, বমি হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি সমস্যা দেখা যেতে পারে।
প্রতিদিন একনাগাড়ে সূর্যমুখী বীজ না খেয়ে বরং একঘেয়েমি দূর করার জন্য স্ন্যাকস হিসেবে মাঝেমধ্যে স্বাস্থ্যকর অন্যান্য খাবার খাওয়া যেতে পারে। যেমনঃ বিভিন্ন ধরনের বাদাম, কুমড়োর বিচি ইত্যাদি।
সূর্যমুখী বীজ কাঁচা খাওয়া যাবে অথবা আপনি চাইলে ভেজে খেতে পারেন। তবে কাঁচা অবস্থায় খাওয়ার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি উপকারিতা পাওয়া যায়। কারণ আগুনের তাপে পুষ্টিগুণ কিছুটা কমে যায়।
কাদের জন্য খাওয়া যাবে না?
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত সূর্যমুখী বীজ খাওয়া যাবে না। কারণ সূর্যমুখী বীজে সোডিয়াম রয়েছে যা ব্লাড প্রেসার বাড়িয়ে দিতে পারে।
সাধারণত সূর্যমুখী বীজ খাওয়ার ফলে এলার্জি দেখা যায় না। তবে কারো ক্ষেত্রে এলার্জি হলে সূর্যমুখী বীজ খাওয়া যাবে না। এলার্জির লক্ষণ হলো ত্বকে র্যাশ হওয়া, চুলকানি, মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি।
References
Garg, D. P. (2023, May 8). 13 Health Benefits of Sunflower Seeds You Should Know! Retrieved from PharmEasy: https://pharmeasy.in/blog/health-benefits-of-sunflower-seeds/
Meixner, M. (2020, August 10). Are Sunflower Seeds Good for Weight Loss? Retrieved from healthline: https://www.healthline.com/nutrition/sunflower-seeds-and-weight-loss
Last Updated on December 21, 2023
Leave A Comment