সহজ ভাবে বলতে গেলে হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই তীব্র ভয় পাওয়া বা অহেতুক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে তাকে প্যানিক অ্যাটাক (Panic attack) বলা হয়। প্যানিক অ্যাটাকের ফলে মানসিক ও শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। যেমনঃ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা, মনে হয় যেন হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তীব্র মৃত্যু ভয়, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, হার্ট বিট বেড়ে যাওয়া, শরীর কাঁপতে থাকা, মাথা ঘোরানো, শ্বাসকষ্ট হওয়া, বুক ধড়ফড় করা ইত্যাদি। 

প্যানিক অ্যাটাক কখনো প্রাণঘাতী হয় না‌ এবং এই সমস্যা সমাধানের জন্য সাধারণত চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না।‌ যেসব উপায় অবলম্বন করে প্যানিক অ্যাটাক বন্ধ করা যায় তা নিয়ে এই অনুচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং প্যানিক অ্যাটাক প্রতিরোধে করণীয় কি সেই ব্যাপারে জানতে শেষ পর্যন্ত পড়তে থাকুন।‌ 

প্যানিক অ্যাটাক বন্ধের উপায় 

প্যানিক অ্যাটাক বন্ধ করার ১০ টি উপায় নিচে তুলে ধরা হলোঃ (Gotter, 2023) 

লম্বা লম্বা শ্বাস নেওয়া 

image3 5

প্যানিক অ্যাটাকের সময় ঘন‌ ঘন শ্বাস প্রশ্বাসের ফলে অক্সিজেন গ্রহণ এবং কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। শরীরে কার্বন ডাইঅক্সাইড কমে গেলে রক্ত নালী সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। এর ফলে মাথা ঘোরা সহ হাতে পায়ে শক্তি পাওয়া যায় না এবং অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্যানিক অ্যাটাকের সময় লম্বা লম্বা শ্বাস নেওয়া এবং ধীর গতিতে শ্বাস ত্যাগ করা বেশ উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে। 

শান্ত হয়ে বসে নাক দিয়ে লম্বা লম্বা শ্বাস নিন। সহজে যতক্ষণ সম্ভব হয় ততক্ষণ শ্বাস আটকে রাখুন। অতঃপর ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস ফেলুন। শ্বাস প্রশ্বাসের এই প্রক্রিয়ায় ‘৪ সেকেন্ড’ নীতি অনুসরণ করতে পারেন। যেখানে ৪ সেকেন্ড সময় শ্বাস গ্রহণ করা এবং কিছুক্ষণ আটকে রাখার পর ৪ সেকেন্ড সময়ে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। 

নিজেকে শান্ত রাখুন 

প্যানিক অ্যাটাক হলে বুকে ব্যথা হতে পারে যার ফলে মনে হয় যেন হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এবং তীব্র মৃত্যু ভয় কাজ করে। এই সময় নিজেকে আশ্বস্ত করতে হবে যে, প্যানিক অ্যাটাকে বুকে ব্যথা হলেও তা হার্ট অ্যাটাক নয় এবং এক্ষেত্রে মৃত্যু ঝুঁকি একদম নেই বললেই চলে।‌ 

প্যানিক অ্যাটাক এবং হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণের পার্থক্য জানা থাকা জরুরী যেন প্রকৃত হার্ট অ্যাটাক হলে জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া যায়। 

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে বুকে‌‌ চেপে ধরার মত ব্যথা হয়, ব্যথা বুকের বাম পাশ থেকে শুরু হয়ে কাঁধ, ঘাড়,‌ গলা ও চোয়ালের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যথার তীব্রতা সময়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ‌ ব্যতীত নিরাময় আশা করা যায় না।

অন্যদিকে প্যানিক অ্যাটাকের ক্ষেত্রে বুকের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ব্যথা হয় না এবং ব্যথা সাধারণত ছড়িয়ে পড়ে না। আর বুকে‌ ব্যথা কয়েক মিনিট থেকে সর্বোচ্চ ১ ঘন্টার মধ্যে চিকিৎসা ছাড়াই এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। 

চোখ‌ বন্ধ করা 

বাইরের উত্তেজনা পূর্ণ পরিবেশের প্রভাবে প্যানিক অ্যাটাক হলে কিছুক্ষণ সময় চোখ বন্ধ করে থাকুন। এবার লম্বা লম্বা শ্বাস নিন এবং ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ত্যাগ করুন। চোখ বন্ধ করে রাখা এক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব আপনার উপর কিছুটা কম পড়তে সাহায্য করবে। 

মাইন্ডফুলনেস (Mindfulness) 

মাইন্ডফুলনেসের মূল বিষয়বস্তু হল বর্তমানে বসবাস করা। অর্থাৎ অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত না‌ হয়ে বরং বর্তমানের বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া। 

প্যানিক অ্যাটাক ‌হওয়ার বিষয়বস্তু থেকে মনোযোগ সরিয়ে সহজ এবং মজার একটি বিষয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে উল্টো দিকে (১০০ থেকে ১) গণনা করতে পারেন। এটি প্যানিক অ্যাটাক দূর করতে বেশ কার্যকরী একটি পদ্ধতি হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। 

কোনো বস্তুর দিকে মনোযোগ দেওয়া

একদৃষ্টিতে সামনে থাকা কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে দেখতে পারেন। অর্থাৎ সেই বস্তুর দিকে গভীর ভাবে মনোনিবেশ করে সেটির রং, গঠন, দেখতে কত সুন্দর লাগছে ইত্যাদি ভাবতে থাকুন যা প্যানিক হওয়ার বিষয়বস্তু ভুলে যেতে সাহায্য করবে।  

পানি পান করা 

image2 5

প্যানিক অ্যাটাকের সময় গলা শুকিয়ে গেছে এমন অনুভূতি হতে পারে। এই সময়ে এক গ্লাস পানি নিয়ে ধীরে ধীরে পান করুন যা আপনার শরীরে পানি সরবরাহ এবং হার্টের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও কিছু সময়ের জন্য মনোযোগ পানি পান করার দিকে দেওয়ার ফলে প্যানিক অ্যাটাক সহজেই দূর হয়ে যায়।  

ল্যাভেন্ডার অয়েল (Lavender oil) 

ল্যাভেন্ডার অয়েলের ঘ্রাণ নেওয়া প্যানিক অ্যাটাক দূর করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সামান্য তুলা অথবা এক টুকরা কাপড়ে ল্যাভেন্ডার অয়েল মাখিয়ে নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ শুকতে থাকুন। তবে কারো ক্ষেত্রে ল্যাভেন্ডার অয়েলের ঘ্রাণ একান্তই পছন্দ না হলে তাদের জন্য এই পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত হবে না।  

হাঁটাহাঁটি করা 

ধীরে ধীরে ছন্দ মিলিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা অথবা মৃদু প্রকৃতির ব্যায়াম করলে তা প্যানিক অ্যাটাক দূর করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে Endorphins হরমোন নিঃসরণে সাহায্য করে যা শরীরকে রিল্যাক্স করে এবং মন ভালো রাখে। (Smith, 2020) 

আনন্দময় মূহুর্তের কথা মনে করা 

জীবনের আনন্দঘন মূহুর্তের কথা মনে করা অথবা পৃথিবীর সৌন্দর্যময় স্থান গুলোর কথা কল্পনা করা প্যানিক অ্যাটাক কাটাতে সাহায্য করে থাকে। 

দোয়া পড়া 

প্যানিক অ্যাটাক হলে (মুসলমানদের জন্য) দোয়া পড়তে হবে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় মন্ত্র বা শ্লোক পাঠ করতে হবে। এতে করে ধর্মীয় উপকারিতা ছাড়াও মনোযোগ অন্যদিকে দেওয়া সম্ভব হবে যা প্যানিক অ্যাটাক দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।  

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন? 

জীবদ্দশায় এক দুই বার প্যানিক অ্যাটাকের সম্মুখীন হওয়া স্বাভাবিক।‌ তবে ঘন‌ ঘন প্যানিক অ্যাটাক হলে অথবা দীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যা চলতে থাকলে তাকে প্যানিক ডিজঅর্ডার বলা হয়। এটি একটি মানসিক রোগ যার জন্য চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। যেসব ক্ষেত্রে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এর শরণাপন্ন হতে হবে তা হলোঃ 

  • ১ মাসের মধ্যে একাধিক বার প্যানিক অ্যাটাক হওয়া অথবা প্রতি মাসেই প্যানিক অ্যাটাক হওয়া
  • প্যানিক অ্যাটাকের ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা (ঘুম, খাওয়া, পড়ালেখা ইত্যাদি) ব্যাহত হওয়া 
  • আচরণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন তথা অস্বাভাবিকতা দেখতে পাওয়া ইত্যাদি 

যাদের ক্ষেত্রে প্যানিক ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সাইকিয়াট্রিস্ট এর পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। যেমনঃ থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, প্যানিক ডিজঅর্ডারের পারিবারিক ইতিহাস, মাদকাসক্ত, ডিভোর্সের ইতিহাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, নির্যাতন বিশেষ করে যৌন নিপীড়নের ইতিহাস ইত্যাদি। 

প্যানিক ডিজঅর্ডারের চিকিৎসায় নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং কগনিটিভ থেরাপি সেশন (Cognitive-behavior therapy) নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

প্যানিক অ্যাটাক প্রতিরোধের উপায় 

প্যানিক অ্যাটাক প্রতিরোধের শতভাগ কার্যকরী কোনো পদ্ধতি নেই। তবে কতিপয় বিষয় প্যানিক অ্যাটাক প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমনঃ 

  • নিয়মিত ব্যায়াম করা। বিশেষ করে ব্রিদিং এক্সারসাইজ বা শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে হবে।
  • ধুমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা বর্জন করা জরুরী। 
  • অতিরিক্ত চাকফি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। 
  • খাদ্য তালিকায় অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাবার রাখা যাবে না। 
  • মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত মেডিটেশন করতে হবে। 

Bibliography

Gotter, A. (2023, February 28). 12 Ways to Stop a Panic Attack. Retrieved from healthline: https://www.healthline.com/health/how-to-stop-a-panic-attack

Smith, J. (2020, July 22). How can you stop a panic attack? Retrieved from Medical News Today: https://www.medicalnewstoday.com/articles/321510

Last Updated on June 5, 2023