সাধারণ মানুষের তুলনায় ক্রীড়াবিদদের শরীরের গঠন কিছুটা ভিন্নতর হয়ে থাকে। যেমনঃ শরীরে ফ্যাটের পরিমাণ কম থাকে এবং পেশীর গঠন বলিষ্ঠ প্রকৃতির হয়।

একজন ক্রীড়াবিদের জন্য শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরী। তবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে পেশী যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে সবসময় খেয়াল রাখতে হয়। অর্থাৎ বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। 

ক্রীড়াবিদদের ওজন কমানোর জন্য ১০টি কৌশল সম্পর্কে এই অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে। 

১। ক্র্যাশ ডায়েট পরিহার করুন 

শরীরের অতিরিক্ত ওজন দ্রুততম সময়ের মধ্যে কমিয়ে ফেলার জন্য দৈনিক ক্যালরি চাহিদার তুলনায় অনেক কম (দিনে ৮০০ ক্যালরি বা তার চেয়ে কম) খাবার খাওয়া হলে তাকে ক্র্যাশ ডায়েট বলা হয়।

ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্র্যাশ ডায়েট করা যাবে না।‌ কারণ খুব বেশি মাত্রায় ক্যালরি গ্রহণ কমিয়ে দিলে পেশির ক্ষতি হতে পারে।‌ এছাড়াও হরমোন নিঃসরণ ও বিপাক প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। 

ওজন কমানোর প্রক্রিয়া হতে হবে ধীর। সপ্তাহে ১ থেকে ২ পাউন্ড (০.৫ থেকে সর্বোচ্চ ১ কিলোগ্রাম) ওজন কমানো যাবে। ওজন কমানোর জন্য দৈনিক ক্যালরি চাহিদার তুলনায় ৩০০ থেকে ৫০০ ক্যালরি কম গ্রহণ করতে হবে। (Petre, 2019) 

২। বেশি ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার সেবন করুন  

fiber rich foods

শর্করা জাতীয় খাবার (সাদা ভাত ও ময়দার রুটি) যতটা সম্ভব কম খাওয়ার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে একজন ক্রীড়াবিদের জন্য শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়ার পরিমাণ একদম কমিয়ে ফেলা যাবে না। 

কারণ শর্করা গ্রহণের পরিমাণ একদম কমিয়ে দিলে ব্যায়ামের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং পারফর্মেন্স কমে যায়। দৈনিক ক্যালরি চাহিদার ৪০ শতাংশ শর্করা জাতীয় খাবার থেকে গ্রহণ করতে হবে।

শরীরের ওজন অনুপাতে প্রতি কেজির জন্য দৈনিক নূন্যতম ৩ থেকে ৪ গ্রাম শর্করা গ্রহণ করতে হবে।

সরল শর্করা জাতীয় খাবার (সাদা ভাত ও ময়দার রুটি) না খেয়ে বরং ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। যেমনঃ বাদামী চালের ভাত, লাল আটার রুটি, যব, ওটস, ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি। 

৩। কম চিনি যুক্ত খাবার সেবন করুন  

সরল শর্করা জাতীয় খাবার হলো চিনি যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। ক্রীড়াবিদদের জন্য চিনি ও চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করা হলো ওজন কমানোর সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর একটি উপায়।

চিনি বর্জন করা সহজ হলেও চিনিযুক্ত খাবার চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ এমন অনেক খাবারের মধ্যে এতো বেশি পরিমাণে চিনি থাকে যা ধারণা করা যায় না। 

সফট ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস, ফ্রুট জুস, সস, পাউরুটি, কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রিম, বিস্কুট ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে।

প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় চিনির পরিমাণ দেখে কিনতে হবে। অতিরিক্ত চিনি রয়েছে এমন খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়াও চা ও কফির সাথে চিনি যোগ করার অভ্যাস বাদ দিতে হবে।  

৪। বেশি করে প্রোটিন খান 

শরীরের ওজন কমানোর জন্য প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় প্রোটিন জাতীয় খাবার রাখতে হবে। কারণ প্রোটিন জাতীয় খাবার হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে যার ফলে দীর্ঘসময় পর্যন্ত পেট ভরা মনে হবে। এছাড়াও প্রোটিন মেটাবলিসমের (বিপাক প্রক্রিয়া) ক্ষেত্রে প্রচুর ক্যালরি ব্যয় হয় যা শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। 

ওজন কমানোর ক্ষেত্রে পেশী ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্ষতিকর হবে। প্রোটিন জাতীয় খাবার খাওয়া হলে শরীরের ওজন কমে যাবে তবে পেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। 

শরীরের ওজন অনুপাতে প্রতি কেজি ওজনের জন্য দৈনিক ১.৮ থেকে ২.৭ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে।

ভালো মানের প্রোটিন জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে মুরগির মাংস (চামড়া ছাড়া), ডিম, ফ্যাট-ফ্রি দুধ, মাছ, সামুদ্রিক খাবার (চিংড়ি, ঝিনুক, শামুক, স্কুইড, অক্টোপাস), ছোলা, ডাল, মটরশুটি, বাদাম ইত্যাদি।

৫। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে

ক্রীড়াবিদদের জন্য কমবেশি সবসময়ের জন্যই ব্যায়াম করতে হয়। কারণ ব্যায়াম না করলে ফিটনেস ও পারফর্মেন্স খারাপ হয়ে যেতে পারে।

শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। ব্যায়াম করার সময় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। যেমনঃ ওয়ার্ম আপ (Warm up), স্পোর্টস সু পরিধান, পর্যাপ্ত পানি খাওয়া ইত্যাদি। 

ব্যায়ামের পর স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস খেতে হবে। যেমনঃ বাদাম, কুমড়ার বিচি, সূর্যমুখী বীজ, ফলমূল, লো-ফ্যাট দুধ ইত্যাদি। 

৬। পর্যাপ্ত তরল পান করুন 

drink enough water

ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে ব্যায়ামের ফলে প্রচুর ঘাম হয় যার মাধ্যমে শরীর থেকে অনেক পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। শরীরের পানি স্বল্পতা দূর করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার স্যালাইন ও পানি পান করতে হবে।‌  

লো-ক্যালরি স্পোর্টস ড্রিংকস ও ডাবের পানি খাওয়া যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় (যেমনঃ সফট ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস, ফ্রুট জুস ইত্যাদি) পান করা উচিত হবে না।  

৭। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন

প্রতি ১ গ্রাম অ্যালকোহল থেকে ৭ ক্যালরি পাওয়া যায় যা শরীরের ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়াও অ্যালকোহল পান করার নেতিবাচক প্রভাব ক্রীড়াবিদদের পারফর্মেন্স খারাপ করে দিতে পারে।  

অ্যালকোহল পান করার অভ্যাস থাকলে বর্জন করা জরুরী। ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে বিয়ার (Beer) খাওয়ার প্রবণতা দেখা যায় যা অ্যালকোহল সমৃদ্ধ একটি পানীয়।

অ্যালকোহল সমৃদ্ধ পানীয় ক্রীড়াবিদদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই‌ জাতীয় পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। 

৮। পর্যাপ্ত ঘুমান 

ক্রীড়াবিদদের জন্য সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি ঘুমের প্রয়োজন পড়ে। কারণ ব্যায়ামের ফলে শরীরে যে ঘাটতি হয় তা ঘুমের সময় পূরণ হয়ে থাকে। 

সাধারণ মানুষের জন্য দৈনিক ৭ থেকে ৯ ঘন্টা ঘুম যথেষ্ট। ক্রীড়াবিদদের জন্য দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘন্টা ঘুমাতে হবে। (Griffin, 2021)

রাতে যথাসময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে। রাত জেগে থাকলে ঘুমের ঘাটতি সহ ক্ষুধার অনুভূতি হতে পারে যার জন্য খাবার (অতিরিক্ত ক্যালরি) গ্রহণের প্রয়োজন হয়। 

৯। স্ট্রেস কমান

অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে এডরেনাল গ্ল্যান্ড (Adrenal gland) থেকে বেশি পরিমাণে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ হয়। কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে ঘন ঘন‌ ক্ষুধা পায় যা শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

এছাড়াও মানসিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাবে ক্রীড়াবিদদের পারফর্মেন্স খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। 

মেডিটেশন ও যোগব্যায়াম (Yoga) মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

১০। ধীরে ধীরে ক্যালরি বাড়ান 

ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শরীরের ওজন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমানোর পর হঠাৎ করেই ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে দেওয়া যাবে না। ধীরে ধীরে বাড়াতে (এডজাস্ট করতে) হবে।

ওজন কমানোর জন্য কম খাবার খাওয়ার সময় শরীরের হরমোন নিঃসরণ ও মেটাবলিসম যেভাবে হয়ে থাকে তাতে হঠাৎ করে ক্যালরি গ্রহণ অনেক বাড়িয়ে দিলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

ক্যালরি গ্রহণ হঠাৎ করে না বাড়িয়ে বরং ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে যেন হরমোন নিঃসরণ ও মেটাবলিসম রেট ভালো থাকে এবং পুনরায় ওজন বেড়ে না যায়।‌ 

সাধারণ মানুষের তুলনায় ক্রীড়াবিদদের জন্য ভিন্ন ধরনের ডায়েট প্ল্যান মেনে চলতে হয়। ক্রীড়াবিদদের ডায়েট প্ল্যান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়ার জন্য পুষ্টিবিদ বা স্পোর্টস কোচের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

References

Griffin, R. M. (2021, July 07). Can Sleep Improve Your Athletic Performance? Retrieved from WebMD: https://www.webmd.com/fitness-exercise/features/sleep-athletic-performance

Petre, A. (2019, April 16). 9 Science-Based Ways for Athletes to Lose Weight. Retrieved from healthline: https://www.healthline.com/nutrition/9-weight-loss-tips-for-athletes

Last Updated on December 31, 2023