মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় বিধান পালনের উদ্দেশ্যে রোজা রাখতে হয়। রোজা রাখার কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে যা বিভিন্ন সময়ের গবেষণায় উঠে এসেছে। এছাড়াও এই বিষয়ে এখনো গবেষণা বিদ্যমান রয়েছে এবং গবেষণার মাধ্যমে রোজার আরো অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা জানা যাবে বলে আশা করা যায়।

এই অনুচ্ছেদে রোজা রাখার ৮টি স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও রোজা রাখার ফলে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়ার জন্য কি কি নিয়ম মেনে খাবার খাওয়া উচিত সেই বিষয়ে জানতে শেষ পর্যন্ত পড়তে থাকুন।

১। রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ

blood pressure control

শরীরের কোষগুলো ইনসুলিন হরমোনের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে গেলে তাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। রোজা রাখার ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমে যায়। অর্থাৎ টাইপ-২ ডায়াবেটিস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়। (Hossain, 2023) 

ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীরা রোজা রাখতে পারবেন এবং এতে করে স্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন উপকারিতা বয়ে আনবে। তবে এক্ষেত্রে ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।  

রোজা রেখে রক্তে সুগারের মাত্রা পরীক্ষা করা যাবে এবং এতে রোজার কোনো ক্ষতি হবে না। রক্তে সুগারের মাত্রা অনেক কমে গেলে (৩.৯ এর কম) রোজা ভেঙ্গে প্রয়োজনীয় খাবার ব্যবস্থা করতে হবে ।

২। প্রদাহ নিরাময়

পেটের (অন্ত্র) ভেতর অসংখ্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে। রোজা রাখার ফলে এদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। আর এই ধরনের ব্যাকটেরিয়া প্রদাহ নিরাময়ের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

রোজা রাখার মাধ্যমে অটোফেজি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। অটোফেজির মাধ্যমে কোষে উৎপাদিত বর্জ্য উপাদান অপসারণ হয় যা শরীরের কোষ ভালো রাখার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। রোজা রাখার অভ্যাস দীর্ঘজীবী হতে সাহায্য করে।

৩। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

উচ্চ রক্তচাপ খুব কমন একটি সমস্যা যার ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যেমনঃ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক। গবেষণায় দেখা গেছে যে, রোজা রাখা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। (Burjeel Hospital, 2022)

ঘুমের সমস্যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় একথা সবারই জানা। রোজা রাখা ঘুমের সমস্যা দূর করার মাধ্যমেও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

৪। কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

হার্টের প্রধান শত্রু হলো কোলেস্টেরল।‌ রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

রোজা রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সহায়তা করে। তাই হার্ট সুস্থ রাখার ব্যাপারে রোজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

হার্টের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি রোজা রাখতে পারবেন। তবে জটিল কোনো সমস্যা (হার্টে রিং পরানো, হার্টের রক্তনালীর বাইপাস সার্জারি, হার্টে পেসমেকার বসানো ইত্যাদি) থাকলে সেক্ষেত্রে রোজা রাখার ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

৫। মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি

রোজা‌ রাখার ফলে মস্তিষ্কে কিছু উপকারী রাসায়নিক উপাদানের উৎপাদন বেড়ে যায় যা মস্তিষ্কের কোষ ভালো রাখতে সাহায্য করে।

বিশেষ করে NGF (nerve growth factor) ও BDNF (brain-derived neurotrophic factor) এর মাত্রা বেড়ে যায়। যার ফলে স্মৃতিশক্তি ভালো থাকে এবং শেখার (Learning) সক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

বয়সজনিত মস্তিষ্কের রোগ (আলজেইমার্স ডিজিজ) প্রতিরোধের ক্ষেত্রে রোজা রাখা উপকারী হতে পারে। এই রোগের ফলে স্মৃতিশক্তি কমে যায়। এছাড়াও পারকিনসনস ডিজিজের (স্নায়ুতন্ত্রের রোগ) ঝুঁকি কমাতে রোজার ভূমিকা রয়েছে। 

৬। ওজন নিয়ন্ত্রণ

শরীরের অতিরিক্ত ওজন বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যেমনঃ হার্টের রোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি। রোজা রাখা শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রোজা রাখলে দীর্ঘসময় পর্যন্ত না খেয়ে থাকতে হয়। এই সময়ে শরীরের ক্যালরি চাহিদা পূরণের জন্য শরীরে জমে থাকা চর্বি ভেঙে ক্যালরি উৎপন্ন হয়। যার ফলে শরীরের ওজন কমে যায়।

এছাড়াও রোজা রাখা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দেয়। তাই যাদের শরীরের ওজন বেশি তাদের জন্য রোজা রাখা ওজন কমানোর পক্ষে বেশ সুবিধাজনক হবে।

৭। ক্যান্সার প্রতিরোধ

cancer

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্যান্সার প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে দেখা যায়। এছাড়াও ক্যান্সারের চিকিৎসা খুব ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। তাই ক্যান্সার প্রতিরোধ করা হলো উত্তম পন্থা।

রোজা রাখা ক্যান্সার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।‌ এছাড়াও ক্যান্সার চিকিৎসা চলাকালীন সময় রোজা রাখার মাধ্যমে উপকার পাওয়া যায়। তবে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে রোজা রাখার ব্যাপারে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

৮। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অনেক ভূমিকা রয়েছে। কারণ শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে।

শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে রোজা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রোজা রাখার ফলে সহজে রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেকাংশেই কমে যায়।

রোজার সঠিক খাদ্যাভ্যাস

১. রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারিতা পাওয়ার জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা জরুরী। আমাদের দেশে রমজান মাসে যেসব খাবার (তেলে ভাজা খাবার) খাওয়ার ধুম পড়ে যায় সেগুলোর বেশিরভাগই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী নয়।‌ বরং ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। 

২. সেহরি ও ইফতারের সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। তবে ফলের জুস ও চিনি মেশানো শরবত না খাওয়াই ভালো। চা ও কফি পানের অভ্যাস কমাতে হবে। কোমল পানীয় একদম বর্জন করতে হবে।

৩. সেহরিতে প্রোটিন জাতীয় খাবার কম খেতে পারলে ভালো। কারণ প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি খেলে দিনের বেলায় পানির পিপাসা বেড়ে যায়। ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে। প্রচুর পরিমাণে সালাদ খাওয়া ভালো।

৪. রোজার সময় অনেকেই সেহরি ও ইফতারে প্রচুর পরিমাণ খাবার খেয়ে থাকেন যা মোটেও স্বাস্থ্যকর বিষয় নয়। সারা দিনে না খেয়ে থাকতে হবে বলেই রাতে অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া উচিত হবে না। 

শেষ কথা

রোজা রাখার ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। রোজার স্বাস্থ্য উপকারিতা পাওয়ার জন্য ইফতার ও সেহরিতে স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে একথা ভুলে গেলে চলবে না।

বিশেষ করে তেলে ভাজা খাবার (পেঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনি, হালিম, কাবাব, বুন্দিয়া, জিলাপি ও কোমল পানীয় সহ সবধরনের ফাস্টফুড) খাওয়ার অভ্যাস বর্জন করতে হবে। 

References

Burjeel Hospital. (2022, April 11). Ramadan Fasting & The Many Health Benefits. Retrieved from Burjeel Hospital: https://burjeel.com/the-many-health-benefits-of-fasting-during-ramadan/

Hossain, F. A. (2023, March 22). Top 5 health benefits of fasting in Ramadan. Retrieved from The Daily Star: https://www.thedailystar.net/life-living/health-fitness/news/top-5-health-benefits-fasting-ramadan-3278071?amp

Last Updated on January 2, 2024