প্যানক্রিয়াটাইটিস কি? মানুষের পেটের ভেতর পাতার মতো দেখতে একটি অঙ্গ রয়েছে যার নাম হলো প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়। কোনো কারণে প্যানক্রিয়াসে প্রদাহ হলে তাকে মেডিকেলের ভাষায় প্যানক্রিয়াটাইটিস বলা হয়। এটি একটি জটিল প্রকৃতির রোগ যার জন্য অগ্ন্যাশয় বিশেষজ্ঞ বা গ্যাস্ট্রোলিভার বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন পড়ে।

এই অনুচ্ছেদে প্যানক্রিয়াটাইটিসের ধরন, কারণ, কাদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার অধিক ঝুঁকি রয়েছে (রিস্ক ফ্যাক্টর), রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পদ্ধতি, জটিলতা ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। 

প্যানক্রিয়াটাইটিসের (Pancreatitis) প্রকারগুলি কী কী?

প্যানক্রিয়াটাইটিস মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে। যথাঃ 

  • একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস (Acute Pancreatitis): হঠাৎ আক্রমণ হয় এবং অল্পসময় প্রদাহ থাকে। কখনো কখনো এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। তবে তীব্র প্রকৃতির প্রদাহ হলে সেক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। 
  • ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিস (Chronic Pancreatitis): ধীর গতিতে ও রোগীর অজ্ঞাতসারে আক্রমণ শুরু হয়। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী বুঝতে পারে না। এই ধরনের প্যানক্রিয়াটাইটিস দীর্ঘদিন ধরে থাকে এবং চিকিৎসার মাধ্যমে একদম ভালো হয়ে যায় না। 

এই অনুচ্ছেদে একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অনুচ্ছেদের পরবর্তী অংশে প্যানক্রিয়াটাইটিস বলতে মূলত একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস বোঝানো হয়েছে।

প্যানক্রিয়াটাইটিসের (Pancreatitis) লক্ষণগুলো কি কি?  

Pancreatitis Syndromes

একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ করে পেটের মাঝ বরাবর ব্যথা হওয়া। ব্যথা মৃদু থেকে তীব্র প্রকৃতির হয়ে থাকে এবং পেট থেকে পরবর্তীতে পিঠের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। পেট ব্যথা ছাড়াও আরো যেসব লক্ষণ দেখা যেতে পারে তা হলোঃ 

  • বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া 
  • জ্বর (Fever)
  • পেট ফুলে যাওয়া  
  • ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস 
  • হার্টবিট বেড়ে যাওয়া 

খাবার ও পানীয় গ্রহণের ফলে এই ধরনের ব্যথা বেড়ে যায়। তবে সামনের দিকে ঝুঁকে থাকলে ব্যথা কিছুটা কম অনুভূত হয়। শুয়ে পড়া বা হাঁটাহাঁটি করলে ব্যথা বেড়ে যায়। 

একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে জরুরী ভিত্তিতে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

প্যানক্রিয়াটাইটিসের কারণ এবং রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো কী কী? 

সাধারণত পিত্তথলির পাথর ও মদ্যপানের কারণে একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়ে থাকে। পিত্তথলির পাথর পিত্তনালী বেয়ে প্যানক্রিয়াসের মুখে অবস্ট্রাকশন বা বাঁধার সৃষ্টি করলে প্যানক্রিয়াস থেকে নিঃসৃত হওয়া এনজাইম প্রবাহ হতে পারে না। যার ফলে প্রদাহ বা একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়ে থাকে। উল্লেখ্য, প্যানক্রিয়াস থেকে খাবার হজমে সহায়ক বিভিন্ন এনজাইম নিঃসরণ হয় এবং নালীর (Pancreatic duct) মাধ্যমে ডিউডেনামে এসে পৌঁছায়। 

কাদের ক্ষেত্রে পিত্তথলির পাথর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে সেই সম্পর্কে জানতে এই অনুচ্ছেদটি পড়ুন। 

মদ্যপানে সাথে একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস হওয়ার যোগসূত্র রয়েছে। তবে মদ্যপান ঠিক কিভাবে প্যানক্রিয়াটাইটিস সৃষ্টি করে সেই বিষয়টি চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো স্পষ্ট নয়। (National Health Service, UK, 2022) 

পিত্তথলির পাথর ও মদ্যপান ছাড়াও আরো যেসব কারণে একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে তা হলোঃ 

  • ইনফেকশন 
  • সার্জারির সময় আঘাত লাগা 
  • Hypertriglyceridemia বা রক্তে  অতিরিক্ত মাত্রায় ট্রাইগ্লিসারাইড
  • Hypercalcaemia বা রক্তে অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যালসিয়াম 
  • ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া 
  • অটোইমিউন ডিজিজ 

যাদের শরীরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, ধুমপানের অভ্যাস রয়েছে, বয়স্ক ব্যক্তি অথবা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্যানক্রিয়াটাইটিস হওয়ার ইতিহাস রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। 

প্যানক্রিয়াটাইটিস নির্ণয় (Diagnosis)

Pancreatitis Diagnosis

প্যানক্রিয়াটাইটিস নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর পেট পর্যবেক্ষণ করে ব্যথার প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেন। এছাড়াও কারণ ও প্যানক্রিয়াসের অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য কিছু টেস্ট (Tests) করার নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। (Brazier, 2023) 

    • পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্ক্যান (CT scan) বা এমআরআই (MRI) করে প্যানক্রিয়াসের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। 
    • রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন এনজাইমের (Amylase, Lipase) মাত্রা দেখা হয়। 
  • ইআরসিপি (ERCP- Endoscopic retrograde cholangiopancreatography) যা একধরনের এন্ডোসকপি পরীক্ষা। এর মাধ্যমে পিত্তথলির পাথর বা নালীতে কোনো বাঁধা রয়েছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। 

প্যানক্রিয়াটাইটিস (Pancreatitis) এর চিকিৎসা

একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের চিকিৎসার জন্য রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হবে। পেট ব্যথা নিরাময়ের জন্য চিকিৎসক ব্যথা নাশক ওষুধ শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করেন। এই সময়ে রোগীকে মুখে কোনো খাবার বা পানীয় দেওয়া হয় না।‌ তবে শরীরে পানির ঘাটতি যেন না হয় সেজন্য শিরায় স্যালাইন দেওয়া হয়ে থাকে। 

রোগীর অবস্থা খুব বেশি সংকটাপন্ন হলে আইসিইউতে (ICU) রাখার প্রয়োজন পড়ে। 

রোগীর অবস্থা কিছুটা উন্নতি হলে একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যেমনঃ পিত্তথলিতে পাথর জনিত একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে সার্জারির মাধ্যমে পাথর অপসারণ করতে হয়। আর ব্যাকটেরিয়া জনিত ইনফেকশন হলে সেক্ষেত্রে এন্টি বায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হয়।

একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে রোগী সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন। বাড়ি ফেরার পর ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে। 

তৈলাক্ত খাবার খাওয়া যাবে না। একবারে বেশি পরিমাণে খাবার না খেয়ে বরং অল্প পরিমাণে বার বার খেতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। তবে অতিরিক্ত চা ও কফি পান করা যাবে না এবং মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা বর্জন করতে হবে।

তাছাড়া, প্যানক্রিয়াটাইসের চিকিৎসায় কিছু সাপ্লিমেন্ট উপকারী হতে পারে।

প্যানক্রিয়াটাইটিস কি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে? 

তীব্র প্রকৃতির একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা না হলে প্যানক্রিয়াসের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত বা ক্রনিক‌ প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে। এছাড়াও ফুসফুস, হার্ট বা কিডনি ফেইলুর হয়ে রোগীর মৃত্যু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। 

২০১৯ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী সারাবিশ্বে একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৮ লাখ মানুষ যার মধ্যে ১১৫০৫৩ জন মৃত্যু বরণ করেছেন অর্থাৎ মৃত্যুর হার ৪ শতাংশেরও বেশি।

প্যানক্রিয়াটাইটিস প্রতিরোধে করণীয় 

একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস একটি জটিল প্রকৃতির রোগ যার জন্য দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে এবং ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুও হতে পারে। তাই এই রোগ যেন না হয় অর্থাৎ একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস প্রতিরোধ করার ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে। বিশেষত মদ্যপান করা থেকে বিরত থাকা জরুরী। এছাড়াও কারো ক্ষেত্রে পিত্তথলিতে পাথর থাকলে সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করতে হবে। আর সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পিত্তথলিতে পাথর যেন না হয় সেজন্য নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে। 

  • লাল মাংস, চর্বিযুক্ত খাবার, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ফাস্টফুড ইত্যাদি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। 
  • প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে। 
  • কখনো কোনো বেলার খাবার বাদ দেওয়া যাবে না বরং প্রতিবেলার খাবার যথাসময়ে খেতে হবে। 
  • ধুমপানের অভ্যাস বর্জন করতে হবে। অতিরিক্ত চা ও কফি পান করা যাবে না। 

ক্রনিক‌ প্যানক্রিয়াটাইটিসের রোগীদের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার খেতে হবে।

একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের ঝুঁকি কমাতে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরী। তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতে হবে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।    

শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানোর ১৪টি টিপস জানতে এই অনুচ্ছেদটি পড়ুন। 

References

Brazier, Y. (2023, January 06). Acute pancreatitis. Retrieved from Medical News Today: https://www.medicalnewstoday.com/articles/160427

National Health Service, UK. (2022, May 24). Acute pancreatitis. Retrieved from NHS: https://www.nhs.uk/conditions/acute-pancreatitis/causes/

Last Updated on November 20, 2023