রূপচর্চা আর ডায়েটের এই যুগে ‘কোলাজেন’ শব্দটি যেন বিশেষভাবে শোনা যাচ্ছে আজকাল। স্বাস্থ্য ও রূপ সচেতন মানুষদের কাছে এই শব্দটি বেশি পরিচিত কারণ শরীর ও ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে কোলাজেনের কোন বিকল্প নেই! নামটি পরিচিত হলেও, এর সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই বেশিরভাগ মানুষেরই।

কোলাজেন কী?

কোলাজেন হচ্ছে এমন একটি অনু, যা কঠিন, অদ্রবণীয় ও আঁশালো বৈশিষ্ঠ্য নিয়ে মানব দেহে অবস্থান করে। জেনে অবাক হবেন, একজন মানুষের দেহে সবচেয়ে বহুল পরিমাণে পাওয়া প্রোটিনই হচ্ছে এই কোলাজেন। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রমানিত যে, একজন মানুষের শরীরের মোট প্রোটিনের চার ভাগের তিন ভাগই হচ্ছে কোলাজেন। মানব দেহের হাড়, দাঁত, চোখ, চুল, নখ, পেশি, মাংস, টেন্ডন, রক্তনালী, অস্থি, টিস্যু, ত্বক সবখানেই উপস্থিতি পাওয়া যায় এই কোলাজেনের।
(McIntosh J. 2022)

শরীরের যে সব অংশে কোলাজেন সরাসরি প্রভাব ফেলেঃ

প্রায় ২৮ রকমের কোলাজেন পাওয়া যায় একজন মানুষের শরীরে। এদের সবারই গঠন ও কাজের দিক দিয়ে রয়েছে কিছু কিছু ভিন্নতা। এবং এরা সবাইই শরীরের বিভিন্ন অংশের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে সরাসরি। আমাদের দেহের সেই অংশগুলো হলো,

  • হাড়ের জয়েন্ট
  • কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুরক্ষা
  • ত্বকের নমনীয়তা ও টানটান ভাব ধরে রাখা
  • দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষায়
  • হৃদযন্ত্রের প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকতা ধরে রাখা ইত্যাদি।

বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরে অবস্থান করা এসব কোলাজেনের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। সাথে কমতে থাকে শরীরে এদের স্বাভাবিক উৎপাদন হারও। আঁশালো গঠনের এই কোলাজেনের অনুগুলি আস্তে আস্তে শুকিয়ে যেতে থাকে, হতে থাকে দুর্বল। আর শরীরে কোলাজেনের ঠিক এই পরিবর্তনের প্রভাবেই বয়স বাড়ার সাথে সাথে একজন মানুষের শরীরের হাড়, পেশি, অস্থি, চোখের ক্ষমতা ইত্যাদি দুর্বল হতে শুরু করে। বলিরেখার ভাঁজ চেহারা ও শরীরের ত্বকে দেখা যায়।

collagen

কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের ব্যবহারঃ

আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, বাইরে থেকেও আমাদের শরীরের বিভিন্ন কাজে কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার হয়ে থাকে।

১. ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতেঃ

বয়সকে তো চাইলেও আটকানো যায় না, তবে শরীরে ও ত্বকে বয়সের ছাপ আটকানোর জন্য বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কোলাজেন। রূপচর্চার বিভিন্ন উপটান, ক্রিমের উপাদান হিসেবে কোলাজেন তো ব্যবহার হচ্ছেই। তেমনি পাওয়া যাচ্ছে মুখে খাওয়ার সাপ্লিমেন্ট হিসেবেও। আছে ত্বকে ব্যবহার করার ইনজেকশন রূপেও। তবে এগুলো বেশ ব্যয়বহুলও বটে।

collagen supplements for skin

২. ক্ষত সারাতেঃ

একজন মানুষের শরীরের কোন অংশ কেটে গেলে, ছিলে গেলে কিংবা আঘাতপ্রাপ্ত, ক্ষত হলে, সেই অংশ সারিয়ে তুলতে প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের শরীরের ভেতর অবস্থানরত কোলাজেন গুলো কাজ করতে থাকে। আঘাত বা ক্ষত বড় হলে, তা দ্রুত সারিয়ে তোলার জন্য বাইরে থেকেও কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের ড্রেসিং করেন চিকিৎসকরা। এতে আঘাতপ্রাপ্ত টিস্যুগুলি আগের চেয়েও দ্রুত মেরামত, নতুন টিস্যু গঠন ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি রক্তপাত, ব্যাথা ও জ্বালাপোড়ার মাত্রাও কমে। নিজে ক্ষত সারানোর কাজ করার পাশাপাশি, মানুষের শরীরে অন্যান্য যেসকল টিস্যু ক্ষত সারানোর ক্ষমতা রাখে, তাদেরও জাগিয়ে তুলতে ও দ্রুত কাজ করতে সাহায্য করে এই কোলাজেন। ভূমিকা রাখে ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যুর কারনে ক্ষতস্থানে হওয়া দাগ সারিয়ে তুলতেও।

৩. অস্টিওআর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায়ঃ

বয়সের সাথে যখন কোলাজেনের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে, শরীরের হাড়, অস্থি, তরুণাস্থি ইত্যাদিও দুর্বল হতে থাকে। যার পরিনাম হতে পারে অস্টিওআর্থ্রাইটিসের মতো কষ্টকর রোগ। তাই, অস্টিওআর্থ্রাইটিসের লক্ষণ দেখা গেলে চিকিৎসাক্ষেত্রে কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের ব্যবহার হয়ে থাকে।

একটি গবেষণায় দেখা যায় কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া মানুষদের হাড়ের জোড়ার ব্যাথা কমে যায় প্রায় ৪৩% এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের উন্নতিও হয় প্রায় ৩৯% পর্যন্ত।

৪. দাঁতের চিকিৎসায়ঃ

দাঁতের স্বাস্থ্যের সুরক্ষাতেও ব্যবহার আছে কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের। বিশেষ করে দাঁতের বিভিন্ন সার্জারিতে। এমনকি কোন দাঁত তুলে ফেলার প্রক্রিয়াতেও কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের ড্রেসিং ব্যবহার করেন ডেন্টিস্টরা। এতে করে রক্ত দ্রুত জমাট বেধে রক্তপাত বন্ধ হয়, দাঁত তোলার কারনে মাড়ির ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যু দ্রুত সেরে উঠে, এবং সেখানে জীবানুর আক্রমণ রোধ হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, সার্জারি বা দাঁত তোলার পর কোলাজেনের ব্যবহার করলে, ক্ষতস্থান বা সেই ফাঁকা মাড়ির আশে পাশের দ্রুত বর্ধনশীল কোষগুলো সেই ক্ষতস্থানের উপর উঠে যেতে বাঁধা পায়। ফলে ক্ষতস্থান দ্রুত সেরে উঠার সুযোগ পায়।

কোলাজেন সমৃদ্ধ খাবারঃ

আমরা কিন্তু কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট ছাড়াও আমাদের শরীরে কোলাজেনের উৎপাদন প্রাকৃতিকভাবেই বাড়াতে পারি শুধুমাত্র ডায়েটে কোলাজেন যুক্ত কিছু খাবার যোগ করার মাধ্যমেই! দক্ষিন-পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলো, যেমন, করিয়া, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশের মানুষদের বয়সের তুলনায় অনেক বেশি তরুন দেখায়। আর তাঁদের তারুণ্যের রহস্য কিন্তু কোলাজেন যুক্ত খাবারের ডায়েট।

১. মুরগিঃ

বাহ্যিকভাবে ব্যবহৃত কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের একটি অন্যতম উৎস হচ্ছে ‘মুরগি’! মুরগির শরীরে থাকা প্রচুর পরিমাণ কানেক্টিভ বা যোজক টিস্যুইও হচ্ছে মূলত কোলাজেনের একটি বড় উৎস। অর্থাৎ, ডায়েটে মুরগির মাংস রাখতে পারলে, শরীরের আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়বে কোলাজেনের পরিমাণও।

collagen - food

২. মাছ ও সামুদ্রিক মাছঃ

অন্যান্য অনেক প্রানির মতোই মাছের কাঁটা, চামড়া ও লিগামেন্টে রয়েছে কোলাজেন। অনেক গবেষকরাই দাবী করেছেন যে, মাছ, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ থেকে প্রাপ্ত কোলাজেন শরীরে শোষণ হয় তাড়াতাড়ি। তবে মাছের কাঁটা, মাথা, চোখ, আঁশে সর্বোচ্চ পরিমাণ কোলাজেন থাকলেও, সেগুলো সাধারণত খাওয়া হয় না বা খাওয়া যায় না।

৩. ডিমের সাদা অংশঃ

যদিও ডিমে সরাসরি কোলাজেনের উপস্থিতির কথা জানা যায় নি। তবে ডিমের সাদা অংশে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ‘প্রোলিন’। প্রোলিন হচ্ছে এমন এক প্রকার অ্যামিনো এসিড, যা মানুষের শরীরে কোলাজেনের উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। সুতরাং, শরীরে প্রাকৃতিকভাবে কোলাজেনের উৎপাদন বাড়াতে চাইলে ডায়েটে রাখা যেতে পারে ডিম বা ডিমের সাদা অংশ।

৪. ভিটামিন-সি যুক্ত ফলঃ

ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার জন্য ভিটামিন- সি যুক্ত ফলমূল খাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। এর কারণ কোলাজেনের সাথে ভিটামিন-সি এর গভীর সম্পর্ক। ভিটামিন-সি একদিকে যেমন শরীরে উপস্থিত কোলাজেনের মাত্রার ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করে, অন্যদিকে প্রাকৃতিকভাবে বাড়িয়ে তোলে এর উৎপাদনও। তাই শরীর ও ত্বকের সজীবতা ধরে রাখতে টমেটো, লেবু, কমলা, জাম্বুরা, স্ট্রবেরি, আম, আনারস ইত্যাদি জাতীয় ফল খেতে পারেন নিয়মিত।

৫. রসুনঃ

রসুনেও কিন্তু সরাসরি কোলাজেন উপস্থিত থাকে না। তবে এতে ভরপুর পরিমাণে থাকে সালফার। যা এজন মানুষের শরীরে প্রাকৃতিকভাবে কোলাজেনের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য তো করে, সাথে দুর্বল কোলাজেনের ভেঙ্গে পরাও রোধ করে।

৬. কাজুবাদামঃ

প্রচুর পরিমাণে জিঙ্ক ও কপারে ভরপুর হচ্ছে কাজুবাদাম। এই দুটোই কিন্তু শরীরে কোলাজেনের উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা বাড়াতে সক্ষম। তাই নিয়মিত কিছু কাজুবাদাম খাওয়া হতে পারে আপনার শরীর ও ত্বকের জন্য খুবই উপকারী।

শুধু কোলাজেন যুক্ত খাবার গ্রহন কিংবা কোলাজেনের সাপ্লিমেন্ট নিলেই তো হবে না, সুরক্ষিত রাখতে হবে শরীরের ভেতরে অবস্থানরত কোলাজেন অণুদেরও। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত, ক্যাফেইনযুক্ত, এবং প্রক্রিয়াজাত শর্করা জাতীয় খাবার নষ্ট করে দিতে পারে আপনার শরীরের প্রাকৃতিক কোলাজেন। তাই স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এড়িয়ে চলতে পারেন এগুলো।

References

McIntosh, j.(2023, Jan 5).What is collagen, and why do people use it? Retrieved from Medical News Today:
https://www.medicalnewstoday.com/articles/262881

Last Updated on November 1, 2023