লেবু (Lemon) আকারে খুব ছোট হলেও এর পুষ্টিগুণ কিন্তু অনেক বেশি। গরম কালে এক গ্লাস লেবুর শরবত, রিচ ফুডের সাথে এক টুকরো লেবু, অথবা শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট/চর্বি দূর করতে এবং রোগ জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধে লেবু অত্যন্ত উপকারী একটি খাবার। লেবুর স্বাস্থ্যগুণ সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানেন কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, লেবুর খোসা (Lemon peels) খাওয়া যায় এবং তা কতটা উপকারী?

গবেষণায় দেখা গেছে যে, লেবুর খোসার মধ্যে শরীরের জন্য উপকারী কতগুলো জৈব যৌগ রয়েছে। আর তাই এই অনুচ্ছেদটি সাজানো হয়েছে লেবুর খোসা খাওয়ার উপকারিতা সমূহ এবং তা কিভাবে খেতে হবে সেই বিষয়ক বিস্তারিত নির্দেশনা নিয়ে। সেই সাথে লেবুর খোসার অন্যান্য ব্যবহার বিধি এবং এর কোনো অপকারিতা রয়েছে কিনা সেই বিষয়ে অনুচ্ছেদের শেষের দিকে আলোচনা করা হয়েছে।

লেবুর খোসা খাওয়ার উপকারিতা

সামান্য পরিমাণে লেবুর খোসা খাওয়ার মাধ্যমে বেশ কিছু পুষ্টিগুণ এবং উপকারিতা পাওয়া সম্ভব। কারণ প্রতি ৬ গ্রাম পরিমাণ লেবুর খোসায় বিদ্যমান রয়েছে ৩ ক্যালরি শক্তি, ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১ গ্রাম ফাইবার, দৈনিক চাহিদার ৯ শতাংশ পর্যন্ত ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সহ সামান্য পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি। তো চলুন, লেবুর খোসা খাওয়ার ৬ বিশেষ টি উপকারিতা সম্পর্কে জানা যাক যা বিভিন্ন সময়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে জানা গেছে। (Lang, 2019)

১. মুখের ভেতরে জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধ করে

মুখের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ এবং দাঁত ও মাড়ির সমস্যা প্রতিরোধে লেবুর খোসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ব্যাপারে একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, লেবুর খোসায় চারটি বিশেষ ধরনের জীবাণু প্রতিরোধী (Antimicrobial) উপাদান রয়েছে যা মুখের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিহত করে।

২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট খুব উপকারী একটি উপাদান যা শরীরের মধ্যে ফ্রি রেডিক্যাল এর সংখ্যা বাড়তে দেয় না। ফ্রি রেডিক্যাল শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের টিস্যু তথা কোষের ক্ষতিসাধন করে থাকে। লেবুর খোসায় প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, আর তাই নিয়মিত এটি খাওয়ার মাধ্যমে হার্টের রোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে যায়। সেই সাথে চেহারায় বয়সের ছাপ দূর করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

লেবুর খোসায় রয়েছে ভিটামিন সি এবং flavonoid যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যার যত বেশি, সহজেই রোগাক্রান্ত হওয়া অথবা রোগ থেকে দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তার তত বেশি। এছাড়াও লেবুর খোসার ফাংগাস প্রতিরোধী ক্ষমতা শরীরে ফাংগাল ইনফেকশন হতে বাধা দেয়।

৪. হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায়

লেবুর খোসায় বিদ্যমান ভিটামিন সি, flavonoids ও pectin নামক উপাদানগুলো শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায়। এছাড়াও ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, লেবুর খোসায় থাকা D-limonene নামক উপাদানটি রক্তে অতিরিক্ত মাত্রায় শর্করা ও খারাপ কোলেস্টেরল কমায় এবং সেই সাথে ভালো কোলেস্টেরল (HDL- high density lipoprotein) বৃদ্ধি করার মাধ্যমে হার্ট ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৫. ক্যান্সার প্রতিরোধ করে

লেবুর খোসায় ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান রয়েছে যা শরীরে ক্যান্সার আক্রমণের সম্ভাবনা হ্রাস করে। বিশেষত পাকস্থলীর ক্যান্সার (stomach cancer) প্রতিরোধে লেবুতে থাকা D-limonene নামক উপাদানটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে লেবুর খোসা ক্যান্সারের চিকিৎসায় অথবা ক্যান্সার সারিয়ে তুলতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।

৬. পিত্তথলির পাথর ধ্বংস করে

পিত্তথলিতে পাথর হলে তা সার্জারির মাধ্যমে অপসারণের প্রয়োজন পড়ে। তবে কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, লেবুর খোসা এক্ষেত্রে সার্জারি ছাড়াই পিত্তথলির পাথর পরিপাক নালীর মাধ্যমে নিষ্কাশন হতে সহায়তা করে। তবে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরো অধিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

পিত্তথলিতে পাথর কেন হয় তা জানতে এই অনুচ্ছেদটি পড়ুন।

লেবুর খোসার উপকারিতা ও অপকারিতা

লেবুর খোসার এতসব উপকারিতা জানার পর মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, এর কোনো অপকারিতা রয়েছে কিনা? এযাবৎ কোনো গবেষণায় লেবুর খোসা খাওয়ার অপকারিতা পাওয়া যায় নি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের Food and Drug Administration এটিকে নিরাপদ খাবার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সুতরাং, নিশ্চিন্তে এবং নির্ভয়ে লেবুর খোসা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।

লেবুর খোসা খাওয়ার নিয়ম

লেবুর খোসা খাওয়ার নিয়ম

উপকারিতা জানার হয়তো অনেকেই খেতে চাইবেন কিন্তু লেবুর খোসা কিভাবে খাওয়া যায় সেটাও একটা কথা। চলুন, এই পর্যায়ে লেবুর খোসা খাওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যাক।

১. ডিপ ফ্রিজে রেখে খাওয়ার পদ্ধতি

প্রথমত, লেবুকে জীবাণুমুক্ত করার জন্য আপেলের তৈরি ভিনেগার দিয়ে খুব ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর খাবার পানি দিয়ে ভালভাবে ধুয়ে শুকাতে হবে। এখন লেবুটিকে সারারাত ধরে ডিপ ফ্রিজে রেখে দিন।

বরফ হয়ে থাকা লেবু টিকে পরদিন সকালে হালকা বরফ ছাড়ার পর খোসা এবং বিচি সহ ছেঁচে ভাঙ্গুন অথবা ব্লেন্ড করে নিন। অতঃপর ছেঁচে গুঁড়া করা লেবু অথবা ব্লেন্ডেড লেবু আবারও ফ্রিজে সংরক্ষণ করে রাখুন।

এবার লেবুর রসের শরবত না বানিয়ে সংরক্ষণ করা লেবু দিয়ে স্মুদি বানিয়ে অথবা অন্যান্য খাবারের সাথে মিলিয়ে খেতে পারেন। এই পদ্ধতিতে আপনি লেবু থেকে অনেক গুণে বেশি পুষ্টিগুণ পাবেন।

. লেবুর খোসা সিদ্ধ

লেবুর খোসা ছাড়িয়ে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। অতঃপর তা দুই কাপ পরিমাণ পানিতে নিয়ে সিদ্ধ করতে থাকুন। সিদ্ধ হয়ে গেলে কুসুম গরম অবস্থায় পানিটুকু খেয়ে ফেলুন। এছাড়াও চায়ের সাথে এভাবে খোসা মিশিয়ে খেতে পারেন। যদিও এই পদ্ধতিতে আগুনের তাপে পুষ্টিগুণ কিছুটা কমে যায়, তবে খেতে ভালো লাগবে।

৩. শুকিয়ে খাওয়া

লেবুর খোসা ছাড়িয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকাতে দিন। অতঃপর তা কাঁচের জারে সংরক্ষণ করুন এবং যখন খুশি চায়ের সাথে যোগ করে খেতে পারবেন। এতে করে যেমন চায়ে দারুন ফ্লেভার পাবেন তেমনি পুষ্টিগুণ অনেক বেড়ে যাবে।

৪. সরাসরি খাওয়া

কিছু কিছু জাতের লেবু রয়েছে যেগুলোর খোসা বেশ‌ মোটা এবং উপরে খসখসে প্রকৃতির। ‌এগুলো সরাসরি খাবারের সাথে লেবুর রস না বের করে খোসাসহ চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারবেন যা মোটেও তেতো‌ লাগবে না। তবে দেশি জাতের ছোট লেবু গুলো এভাবে খাওয়া যাবে না, কারণ সেগুলো মুখ তেতো করে ফেলবে।

 

লেবুর খোসার ব্যবহার

খাওয়া বাদে লেবুর খোসা দিয়ে কি হয়? হ্যাঁ, লেবুর খোসার আরো কিছু দারুন ব্যবহার এবং উপকারিতা রয়েছে। যেমনঃ

✓ নখ, হাড়ি পাতিল, জামা কাপড়ের দাগ তুলতে লেবুর খোসা ঘসে ব্যবহার করা যায় যা প্রায় সবারই জানা থাকার কথা।

✓ একটি কাঁচের জারে কয়েক টুকরো লেবুর খোসা এবং ভিনেগার দিয়ে মুখ বন্ধ করে কয়েক সপ্তাহ রেখে দিন। অতঃপর খোসা গুলো ফেলে দিয়ে এর সাথে কিছু পানি যোগ করুন। এবার এটি গৃহস্থালির বিভিন্ন কিছু পরিষ্কার করতে ক্লিনার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।

✓ কয়েক টুকরো লেবুর খোসা ফ্রিজের এককোণে রেখে দিন। এতে ফ্রিজের মধ্যে কোনো বাজে গন্ধ তৈরি হবে না।

✓ বিশেষত স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র, চায়ের কেতলি, মগ ইত্যাদিতে দাগ পড়ে গেলে লেবুর খোসার সাহায্যে ঘসে তা পরিষ্কার ও চকচকে করে ফেলতে পারবেন নিমিষেই।

✓ বডি স্ক্রাব (Body scrub) এবং ফেস মাস্ক (Face mask) হিসেবে অলিভ অয়েলের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন যা ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে সহায়তা করবে।

লেবুর খোসা খেলে কি হয় সেই সম্পর্কে জানার পর আশা করি অনেকেই এটি খেতে শুরু করবেন। সেই সাথে লেবুর খোসার অন্যান্য ব্যবহার বিধি ফলো করে উপকৃত হতে পারেন। তবে হা, এই জন্য কিন্তু অবশ্যই বাজারের লিস্টে নিয়মিত লেবুর কথা লিখতে ভুলে গেলে চলবে না।

 

 

References

Lang, A. (2019, 8 9). 9 Benefits and Uses of Lemon Peel. From Healthline: https://www.healthline.com/nutrition/lemon-peel

 

Last Updated on July 25, 2022

Was this article helpful?
YesNo