যৌন বাহিত রোগে (STDs- sexually transmitted diseases) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন ১ মিলিয়নের বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে যা রীতিমতো ভয়ঙ্কর একটি পরিসংখ্যান। (WHO, 2021) সেই সাথে আরেকটি দুঃখজনক ব্যাপার হলো অধিকাংশ যৌন বাহিত রোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না অথবা সামান্য কিছু লক্ষণ দেখা দিলেও অজ্ঞতা বশত অনেকেই তা বুঝতে সক্ষম হয় না। আবার লক্ষণ বুঝতে পেয়েও লজ্জা ও সংকোচ বোধের কারণে যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে না পারা অনেক দেশের প্রেক্ষাপটে একটি প্রধান সমস্যা।

কি কি লক্ষণ দেখা দিলে বুঝতে পারবেন যে আপনার শরীরে যৌন বাহিত রোগের সংক্রমণ হয়েছে? কোন ধরনের চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে এবং চিকিৎসা গ্রহণ না করলে কি ধরনের জটিলতা হতে পারে? চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে কতটুকু সুস্থতা লাভ করা সম্ভব? ইত্যাদি বিষয়গুলো সহ যৌন বাহিত রোগ প্রতিরোধের কার্যকরী উপায় সমূহ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানতে অনুচ্ছেদটি শেষ পর্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়তে থাকুন।

 

Table of Contents

যৌন বাহিত রোগ কোনগুলো? | What are sexually transmitted diseases (STDs)?

যৌন বাহিত রোগ (STDs- sexually transmitted diseases) বলতে মূলত সেই সমস্ত রোগ গুলোকে বোঝানো হয় যা যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগের লক্ষণ সমূহ সাধারণত যৌনাঙ্গ (Genital organs) কেন্দ্রিক হয়ে থাকে। তবে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা ব্যতীত এবং যৌনাঙ্গ বহির্ভূত লক্ষণ নিয়েও যৌন বাহিত রোগ হতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও প্যারাসাইট (Parasites) এর সংক্রমণের মাধ্যমে যৌন রোগের উৎপত্তি হয়ে থাকে ফলে মেডিকেলের ভাষায় এই রোগকে Sexually transmitted infections বা STIs নামেও অভিহিত করা হয়। STDs এবং STIs এর মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে অর্থাৎ আগে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে যা STIs এবং তারপর শরীরের মধ্যে অস্বাভাবিক কার্যকলাপ তথা রোগের সৃষ্টি হয় যাকে STDs বলে। তবে সাধারণ অর্থে STDs ও STIs উভয়ই যৌন বাহিত রোগ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সবচেয়ে কমন যৌন বাহিত রোগ (STDs) গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ

১. ক্ল্যামিডিয়া (Chlamydia)

২. গনোরিয়া (Gonorrhea)

৩. হারপিস (Herpes)

৪. সিফিলিস (Syphilis)

৫. HPV (Human Papillomavirus)

৬. হেপাটাইটিস এ (Hepatitis A)

৭. হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B)

যৌন বাহিত রোগের সংক্রমণ নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীরে ঘটতে পারে এবং তা যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে একজনের দেহ থেকে অন্যজনের দেহে ছড়িয়ে পড়ে। তবে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা ছাড়াও অন্য উপায়ে কিছু রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে যা নিয়েও এই অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে। তো চলুন এই পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে যৌন বাহিত রোগ গুলো সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানা যাক।‌

১. Chlamydia

ক্ল্যামিডিয়া রোগের চিকিৎসা

ক্ল্যামিডিয়া (Chlamydia) খুব কমন প্রকৃতির একটি যৌন বাহিত রোগ যা Chlamydia trachomatis নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে ঘটে থাকে। পুরুষের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি রয়েছে। ক্ল্যামিডিয়া ব্যাকটেরিয়ার বাহক নারী ও পুরুষ উভয়ই হতে পারে এবং সুস্থ্য কোনো মানুষ আক্রান্ত নারী অথবা পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়। এছাড়াও গর্ভবতী নারী ক্ল্যামিডিয়ায় আক্রান্ত হলে সেক্ষেত্রে গর্ভের শিশুটি এই রোগ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে।

ক্ল্যামিডিয়া রোগের লক্ষণ | Symptoms of Chlamydia in Bengali

যদি একজন পুরুষের শরীরে নিম্নলিখিত লক্ষণ সমূহ দেখা দেয় তাহলে বুঝতে হবে যে ক্ল্যামিডিয়ার সংক্রমণ হয়েছে এবং এই পর্যায়ে যত দ্রুত সম্ভব একজন যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ অথবা মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তবে জীবাণু সংক্রমণের সাথে সাথেই লক্ষণ প্রকাশ পাবে এমনটি নয় বরং লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। আবার অধিকাংশ মানুষের শরীরেই তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না যার ফলে এটিকে silent infection বলা হয়ে থাকে। লক্ষণসমূহঃ

  • প্রস্রাব করার সময় প্রস্রাবের নালীতে জ্বালাপোড়া (Burning)
  • প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে হলুদ বা সবুজ বর্ণের স্রাব (Discharge)
  • অন্ডকোষ ফুলে যাওয়া ও ব্যথা
  • তলপেটে ব্যথা হওয়া ইত্যাদি

যৌনাঙ্গে মুখ লাগানোর (Oral sex) মাধ্যমে এই রোগের জীবাণু গলায় ইনফেকশন ঘটাতে পারে যার লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় গলা ব্যথা, জ্বর, কাশি ইত্যাদি। অপরদিকে ক্ল্যামিডিয়ার সংক্রমণ একজন নারীর দেহে ঘটলে যে সমস্ত লক্ষণ দেখা যায় তা হলোঃ

  • যৌন মিলনের সময় অস্বাভাবিক ব্যথা বোধ (Dyspareunia)
  • প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
  • দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব (Discharge)
  • তলপেটে জ্বালাপোড়া ও ব্যথা
  • দুই মাসিকের মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত (Bleeding) ইত্যাদি

পায়ুপথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের (Anal sex) মাধ্যমে সংক্রমণ পায়খানার রাস্তায় (anus) ঘটে থাকে যার লক্ষণ হিসেবে পায়ুপথ দিয়ে রক্ত ও স্রাব যাওয়া সহ ব্যথা বোধ হতে পারে। ব্যথা ও রক্ত যাওয়ার লক্ষণ পাইলসের (Hemorrhoids) ক্ষেত্রেও হয়ে থাকে তবে এই দুটি রোগের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে এবং চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্নতর।

পাইলস বা অর্শ রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই অনুচ্ছেদটি পড়ুন।

ক্ল্যামিডিয়া রোগের চিকিৎসা | Treatment of Chlamydia in Bengali

লক্ষণ দেখা দিলে ক্ল্যামিডিয়ার সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হবে। যেহেতু অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় না আর তাই নিয়মিত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন এমন ব্যক্তিদের জন্য বছরে অন্তত একবার অথবা নতুন যৌন সঙ্গীর সাথে সহবাসের পরে নিম্নলিখিত টেস্ট করানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে।

  • Physical examination
  • Urine R/E
  • Swab test
  • NAAT (Nucleic Acid Amplification Test)

ক্ল্যামিডিয়ার একমাত্র কার্যকরী চিকিৎসা হলো যথাযথ নিয়ম মেনে এন্টি বায়োটিক ওষুধ সেবন করা। এক্ষেত্রে সাধারণত Doxycycline অথবা Azithromycin ওষুধটি বহুল প্রচলিত ভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে এর বাইরে অন্যান্য এন্টিবায়োটিক ওষুধ কার্যকরী হতে পারে এবং সকল ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের নির্দেশনা মোতাবেক ওষুধ সেবন করতে হবে।

যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগের হাত থেকে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হওয়া যায় তবে চিকিৎসা কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত যৌন মিলন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অথবা পুরুষের জন্য কনডম (Male condom) ব্যবহারের মাধ্যমে যৌন মিলন করা যাবে।

২. Gonorrhea

ক্ল্যামিডিয়ার মতো লক্ষণ বিশিষ্ট আরেকটি যৌন বাহিত রোগ হলো গনোরিয়া (Gonorrhea) যা Neisseria gonorrhoeae নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে হয়ে থাকে। গনোরিয়ায় আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং নারী পুরুষ উভয়ই বাহক হিসেবে এটি বহন করতে পারে। এই রোগ যেকোনো বয়সের মহিলা ও পুরুষের ক্ষেত্রে হতে পারে যা অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ছড়ায়। এছাড়াও এটি গর্ভবতী মায়ের মাধ্যমে শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

গনোরিয়া রোগের লক্ষণ | Symptoms of Gonorrhea in Bengali

গনোরিয়া জীবাণুর সংক্রমণ হলে পুরুষের ক্ষেত্রে ২ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কতিপয় লক্ষণ দেখা যায়। যেমনঃ

  • ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
  • প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ঘন পুঁজের মতো পদার্থ বের হয় যা দুর্গন্ধযুক্ত
  • লিঙ্গের অগ্রভাগ ফুলে যাওয়া
  • অন্ডকোষ ফুলে যাওয়া ও ব্যথা
  • পায়খানার রাস্তায় চুলকানি
  • পেটে ব্যথা ইত্যাদি

মহিলাদের বেলায় গনোরিয়ার সংক্রমণ হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে কারো কারো বেলায় জীবাণু সংক্রমণের কয়েক সপ্তাহ পরে নিম্নলিখিত লক্ষণাবলী দেখা যেতে পারে।

  • যোনি পথে স্রাব (Discharge)
  • ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
  • প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া
  • পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
  • যৌন মিলনের সময় ব্যথা
  • পায়খানার রাস্তায় চুলকানি এবং রক্তপাত (Bleeding)
  • তলপেটে ব্যথা ইত্যাদি

নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই যৌনাঙ্গে মুখ লাগানোর মাধ্যমে গলায় গনোরিয়া জীবাণুর সংক্রমণ হয়ে থাকে। আর এক্ষেত্রে লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় গলা ব্যথা, খাবার গিলতে কষ্ট, গলার আশেপাশে লিম্ফ নোড (Lymph nodes) গুলো ফুলে যাওয়া, জ্বর ইত্যাদি।

যৌনাঙ্গ চোখের সংস্পর্শ নিলে সেক্ষেত্রে চোখে সংক্রমণ হতে পারে তবে এটি খুবই বিরল (Rare case) ঘটনা। এক্ষেত্রে লক্ষণ হিসেবে যে সমস্ত লক্ষণ দেখা যায় তা হলো

  • চোখে ব্যথা ও অস্বস্তি বোধ
  • চোখের পাতা ফুলে যাওয়া
  • চোখ লাল হয়ে যায় এবং জ্বালাপোড়া করে
  • চোখ থেকে হলুদ বর্ণের পুঁজের মতো পদার্থ বের হয় ইত্যাদি

উল্লেখ্য মহিলাদের ক্ষেত্রে আরেকটি ভিন্ন ধরনের জীবাণুর সংক্রমণে প্রায় গনোরিয়া রোগের মতোই লক্ষণ দেখা যায়। যেমনঃ স্রাব, চুলকানি ইত্যাদি। এটিকে মেডিকেলের ভাষায় ইস্ট ইনফেকশন বলা হয় যা কোনো যৌন বাহিত রোগ নয়। এই রোগের জন্য দায়ী হলো candida albicans নামক একপ্রকার ছত্রাক। গনোরিয়া আর ঈস্ট ইনফেকশনের পার্থক্য নির্ণয় পূর্বক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে কারণ এই দুইটি রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা।

 

গনোরিয়া রোগের চিকিৎসা | Treatment of Gonorrhea in Bengali

ক্ল্যামিডিয়া ও গনোরিয়ার লক্ষণ সমূহ প্রায় একই রকম তবে দুটি ভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের মাধ্যমে এই রোগ গুলো হয়ে থাকে। এই দুইটি রোগ একই ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়।

  • Physical examination
  • Urine R/E
  • Swab test
  • NAAT (Nucleic Acid Amplification Test)

পরীক্ষার মাধ্যমে গনোরিয়ার সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় এন্টি বায়োটিক ও সহযোগী ওষুধ সমূহ সেবন করতে হবে।

গনোরিয়া রোগের জটিলতা

মনে রাখবেন যথাসময়ে ক্ল্যামিডিয়া ও গনোরিয়ার চিকিৎসা গ্রহণ করা না হলে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে PID (Pelvic inflammatory disease) রোগের সৃষ্টি হয় যেখানে তলপেটে মারাত্বক ব্যথা হয় এবং জরুরি ভিত্তিতে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। PID এর ফলে নারীর যৌনাঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সন্তান ধারণের সক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে ফ্যালোপিয়ান টিউবের মধ্যে গর্ভধারণ (Ectopic pregnancy) হয় যা একটি অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা গর্ভবতী মায়ের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে থাকে।

পক্ষান্তরে পুরুষের ক্ষেত্রে গনোরিয়ার জটিলতা হিসেবে প্রস্রাব নালীতে (Urethra) ক্ষত, শুক্রাণু উৎপাদন ব্যহত হওয়া, যৌন দুর্বলতা (Erectile dysfunction), সন্তান জন্ম দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে। এছাড়াও দীর্ঘদিন যাবত গনোরিয়ার প্রভাবে নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই আর্থ্রাইটিস (arthritis) ও হার্টের ভাল্ব নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতর সমস্যা হতে পারে।

 

৩. Syphilis

Treponema pallidum নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে সিফিলিস (Syphilis) হয়ে থাকে যা তুলনামূলক জটিল প্রকৃতির একটি যৌন বাহিত রোগ। কারণ এটি যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা ছাড়াও বিভিন্ন পদ্ধতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা না হলে পর্যায়ক্রমে রোগটি জটিলতর ধাপে যেতে থাকে। তো চলুন সিফিলিসের ধাপ গুলো এবং জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যাক।

 

সিফিলিস রোগের কয়টি ধাপ রয়েছে? | Phases of Syphilis in Bengali

সিফিলিসের মোট চারটি ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ, দ্বিতীয় ধাপ, তৃতীয় ধাপ বা সুপ্ত দশা এবং চতুর্থ তথা সর্বশেষ ধাপ। সিফিলিস রোগের ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে অবস্থান করে অর্থাৎ এই ব্যাকটেরিয়ার বাহক নারী-পুরুষ উভয়ই হতে পারে। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে সিফিলিসের ক্ষত থেকে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার পদ্ধতি গুলো হলোঃ

  • আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা
  • সিফিলিসের ক্ষত (chancre) এর সংস্পর্শ লাগা
  • আক্রান্ত ব্যক্তির পোশাক, তোয়ালে ও খাবারের বাসন (eating utensils) ব্যবহার করা
  • গর্ভবতী মায়ের শরীর থেকে বাচ্চার শরীরে ছড়িয়ে পড়ে
  • অস্বাস্থ্যকর পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করা ইত্যাদি

 

সিফিলিস রোগের লক্ষণ | Symptoms of Syphilis in Bengali

সিফিলিসের প্রথম ধাপের লক্ষণ

ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশের ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ পর প্রথম ধাপ শুরু হয় এবং এই পর্যায়ে মুখের উপরে বা ভেতরের দিকে, যৌনাঙ্গের আশেপাশে অথবা পায়ুপথের পাশে একটি ক্ষত সৃষ্টি হয় যাকে মেডিকেলের ভাষায় Chancre বলে। এতে সাধারণত কোনো ব্যথা থাকে না এবং ক্ষত দেখা দেওয়ার পরবর্তী ২ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষত টি আপনাআপনি সেরে যায়। সেই সাথে প্রথম ধাপ শেষ হয় কিন্তু রোগের শেষ হয় না বরং সিফিলিস দ্বিতীয় ধাপে চলে যায়।

 

সিফিলিসের দ্বিতীয় ধাপের লক্ষণ

প্রথম ধাপ পার করার কয়েক সপ্তাহ পরে দ্বিতীয় ধাপের লক্ষণাবলী প্রকাশ পায়। এই ধাপে সাধারণত হাত ও পায়ের তালুতে rash দেখা যায় তবে তাতে কোনো চুলকানি থাকে না। এছাড়াও আরো কিছু লক্ষণ দেখা যেতে পারে। যেমনঃ

  • মাথাব্যথা
  • ক্লান্তি
  • জ্বর
  • লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া
  • ওজন কমে যাওয়া
  • শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা
  • মাথার চুল পড়ে যায় ইত্যাদি

 

সিফিলিসের তৃতীয় ধাপ

সিফিলিসের দ্বিতীয় ধাপে চিকিৎসা গ্রহণ করা না হলে লক্ষণ গুলো আপনাআপনি চলে যায় এবং তৃতীয় ধাপ শুরু হয়। আর এই ধাপে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না কিন্তু ব্যাকটেরিয়া শরীরের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় বিরাজমান থাকে। তৃতীয় ধাপ শুরু হওয়ার পর তা কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

 

সিফিলিসের চতুর্থ ধাপ

মানুষের শরীরে সিফিলিসের জীবাণু সংক্রমণের অনেক বছর পরে চতুর্থ ধাপ শুরু হয়। আর এই ধাপে শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেমনঃ

  • অন্ধ হয়ে যাওয়া (blindness)
  • শ্রবণশক্তি নষ্ট হয় (deafness)
  • মানসিক সমস্যা (mental illness)
  • হার্টের রোগ (heart disease)
  • মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডে (Spinal cord) ইনফেকশন ইত্যাদি

 

সিফিলিস রোগের চিকিৎসা | Treatment of Syphilis in Bengali

সিফিলিসের প্রথম ধাপের ক্ষত ব্যথাহীন হয়ে থাকে বলে অধিকাংশ মানুষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে না এবং তেমন কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে না। তবে এই ধাপে চিকিৎসা গ্রহণ করা হলে সহজেই আরোগ্য লাভ করা যায় এবং সিফিলিস পরবর্তী কঠিন ধাপগুলোর দিকে যেতে পারে না।

চিকিৎসা গ্রহণের পূর্বে সিফিলিসের ক্ষত থেকে কোষ তথা নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত ভাবে রোগ নির্ণয় করতে হবে। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের সিফিলিস এর জন্য চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় এন্টি বায়োটিক ওষুধ সেবন করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণত Penicillin ইনজেকশন ব্যবহার করা হয় তবে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য এন্টি বায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে।

সিফিলিসের তৃতীয় ধাপে কোনো লক্ষণ থাকে না এবং পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে তেমন কিছু ধরা পড়ে না। চতুর্থ ধাপে সিফিলিস নির্ণয় করা হলে সেক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে তবে তাতে করে সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হওয়া যায় না। (Johnson, 2019)

উল্লেখ্য গর্ভবতী মহিলা সিফিলিসে আক্রান্ত হলে সেক্ষেত্রে গর্ভপাত (Miscarriage), মৃত বাচ্চা প্রসব করা (still births), গর্ভকালীন পূর্ণ সময় শেষ হওয়ার আগেই বাচ্চা প্রসব করা ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও শিশু কম ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করা সহ শিশুর শরীরে নানাবিধ রোগ (জন্ডিস, রক্ত স্বল্পতা, rashes, জ্বর, লিভার ও প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া, শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ইত্যাদি) হতে পারে।

 

৪. Herpes (simplex)

হারপিস রোগের লক্ষণ

হারপিস রোগের লক্ষণ

হারপিস (Harpes) হলো ভাইরাস ঘটিত যৌন বাহিত রোগ যার জীবাণুর নাম হলো herpes simplex virus বা (HSV)। এই ভাইরাসের দুইটি প্রকরণ রয়েছে।

  • HSV-1 যার সংক্রমণ ঘটে মুখ এবং মুখের আশপাশের ত্বকে
  • HSV-2 এর সংক্রমণ ঘটে যৌনাঙ্গে

একজন HSV ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে হারপিস রোগটি সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যম হলো যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা, যৌনাঙ্গে মুখ লাগানো এবং গর্ভবতী মায়ের মাধ্যমে শিশুর সংক্রমণ ইত্যাদি। রোগের লক্ষণ প্রকাশিত অবস্থায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি থাকে। এছাড়াও ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় শরীরের মধ্যে অবস্থান করে এমন সময়েও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে তবে এক্ষেত্রে সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।

হারপিস রোগের লক্ষণ | Symptoms of Herpes in Bengali

হারপিস ভাইরাস (HSV) শরীরে প্রবেশের ২ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণ প্রকাশ পায়। এক্ষেত্রে সংক্রমণ HSV-1 দ্বারা হলে মুখে ফোস্কা বা ক্ষত (sores) দেখা যায় যা ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে। পক্ষান্তরে HSV-2 এর সংক্রমণ ঘটলে যৌনাঙ্গ অথবা তার আশেপাশে ক্ষত দেখা যায় যা ২ থেকে ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকে। এই সময়ে ক্ষত এর সাথে আরো কিছু লক্ষণ দেখা যায়। যেমনঃ

  • জ্বর
  • ব্যথা
  • ক্ষত এর আশপাশে চুলকানি
  • দুর্বলতা ও ক্লান্তি বোধ ইত্যাদি

 

হারপিস রোগের চিকিৎসা | Treatment of Herpes in Bengali

হারপিস রোগটি একদম সারিয়ে ফেলতে পারে এমন কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। তবে এই রোগের ভাইরাসের বৃদ্ধি প্রতিহত করার জন্য চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী এন্টি ভাইরাল (Antiviral) ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। সেই সাথে ব্যথা ও জ্বর নিরাময়ের জন্য প্যারাসিটামল অথবা অন্য কোনো প্রদাহ নাশক ওষুধ (NSAID- non steroidal anti inflammatory drugs) সেবন করা যাবে।

সাধারণত এন্টি ভাইরাল ওষুধ সেবনের ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ক্ষত সেরে যায় তবে তা পুনরায় ফিরে আসে। গবেষণায় দেখা গেছে যে মুখে হারপিসের সংক্রমণ হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ এবং যৌনাঙ্গে সংক্রমণের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ পুনরাবৃত্তির (recurring) সম্ভাবনা রয়েছে। (Brazier, 2020)

উল্লেখ্য হারপিস একটি ভাইরাস ঘটিত রোগ আর তাই এই রোগের চিকিৎসায় অবশ্যই এন্টি বায়োটিক ওষুধ সেবন করা যাবে না। কারণ এন্টি বায়োটিক শুধুমাত্র ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম, ভাইরাস দমনে এর কোনো ভূমিকা নেই। তবে ক্ষত নিরাময়ের জন্য ঘরোয়া পদ্ধতি হিসেবে পেট্রোলিয়াম জেলি, এলোভেরা জেল, ক্রিম অথবা লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে। সেই সাথে হালকা গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গোসল (sitz bath) করলে কিছুটা উপকার পাওয়া যায়।

সিফিলিস ও হারপিস রোগের ক্ষেত্রে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া এবং রোগ সুপ্ত অবস্থায় চলে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে থাকে। তবে এই রোগ দুইটি সম্পূর্ণ ভাবে আলাদা যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নিচে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলোঃ

 

সিফিলিস (Syphilis) হারপিস (Herpes)
ব্যাকটেরিয়া জনিত ভাইরাস জনিত
ক্ষত একটি, আকারে বড় এবং ব্যথাহীন অনেক গুলো ক্ষত, চুলকানি ও ব্যথা থাকে
সম্পূর্ণ আরোগ্য (Cure) করা যায় নিরাময় (Relief) হয় কিন্তু আরোগ্য হয় না
এন্টি বায়োটিক ওষুধ এন্টি ভাইরাল ওষুধ

 

তবে সিফিলিস ও হারপিসের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে আর তা হলো দুই ধরনের সংক্রমণের সাথেই HIV (human immunodeficiency virus) আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ যাদের শরীরে সিফিলিস অথবা হারপিসের ক্ষত রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে HIV ভাইরাসের সংক্রমণ হওয়ার অধিক সম্ভাবনা রয়েছে যা এইডস রোগ সৃষ্টি করে। আর এইডস (AIDS for acquired immunodeficiency syndrome) হলো একটি যৌন বাহিত রোগ যার কোনো চিকিৎসা নেই এবং এর শেষ পরিণতি হলো মৃত্যু।

 

৫. Human papillomavirus (HPV)

Human papillomavirus

Human papillomavirus

Human papillomavirus বা HPV হলো একধরনের ভাইরাস জনিত সংক্রমণ। এই ভাইরাসের অনেকগুলো প্রকরণ রয়েছে যার মধ্যে ৪০ টি যৌন বাহিত যার খুব অল্প কিছু সংখ্যক প্রকরণ জটিলতর রোগ (ক্যান্সার) সৃষ্টি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি হারে সংঘটিত হওয়া যৌন বাহিত রোগের মধ্যে প্রধান হলো HPV সংক্রমণ। (Gabbey, 2015)

 

HPV এর লক্ষণ | Symptoms of HPV in Bengali

HPV ভাইরাসের সংক্রমণ হলে তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশিত হয় না। তবে ক্ষেত্র বিশেষে যৌনাঙ্গের আশেপাশে অথবা মুখে আঁচিল (Warts) হতে দেখা যায় যা ব্যথাহীন অথবা ব্যথাসহ হতে পারে। আঁচিল বিষয়টি মানুষ বড় কোনো সমস্যা বা রোগ হিসেবে বিবেচনা করে না অথচ ভয়ংকর একটি যৌন বাহিত রোগের উপসর্গ হিসেবে শুধুমাত্র আঁচিল হয়ে থাকে।

আর তাই  আঁচিল দেখা গেলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অতঃপর চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করানোর মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে HPV এর সংক্রমণ হয়েছে কিনা। সংক্রমণ হলে সেক্ষেত্রে অবহেলা না করে যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

HPV এর চিকিৎসা | Treatment of HPV in Bengali

আঁচিলের জন্য মুখে খাওয়ার ওষুধ রয়েছে যা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত সেবন করতে হবে। আঁচিল অপসারণের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যে কোনো ধরনের ব্যবস্থা (সার্জারি অথবা ভিন্নতর কোনো পদ্ধতি যেমন Burning, Freezing ইত্যাদি) গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কখনোই হকারদের কাছ থেকে ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা মলম ব্যবহার করে আঁচিল অপসারণ করা যাবে না।

HPV ভাইরাসটির বাহক কি শুধুই পুরুষ যার মাধ্যমে নারীরা আক্রমিত হয়ে থাকে? বিষয়টি এমন নয় বরং নারী পুরুষ যে কেউ এই রোগের ভাইরাস বহন করতে পারে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে অন্যদের শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করে। HPV সংক্রমণ এর ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা না হলে এই ভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাবে মহিলাদের ক্ষেত্রে জরায়ু মুখের ক্যান্সার (Cervical cancer) হতে পারে। অপরদিকে পুরুষদের জন্য যৌনাঙ্গে, গলায় অথবা পায়ুপথের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

 

উল্লেখ্য

পুরুষের লিঙ্গের (Penis) অগ্রভাগের চামড়া (foreskin) মুসলমানদের ক্ষেত্রে কেটে বাদ দেওয়া হয় যাকে সুন্নাতে খৎনা বলে। এটি একটি স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি যার ফলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি (Personal hyegine) মেনে চলতে সুবিধা হয়। অর্থাৎ লিঙ্গ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে এবং রোগ জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা কমে যায়।

সেই সাথে এখানে জীবাণু লেগে থাকার মাধ্যমে আপনার সঙ্গিনীর শরীরে জীবাণুর আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। তবে শুধুমাত্র Foreskin কে HPV অথবা অন্য কোনো জীবাণু ছড়ানোর জন্য দায়ী করা যায় না। আবার Foreskin কেটে বাদ দিলেই যৌন বাহিত রোগ হবে না এমনটিও নয়।

জরায়ু মুখের ক্যান্সার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এই অনুচ্ছেদটি পড়ুন।

HPV প্রতিরোধের উপায় | How to prevent HPV in Bengali?

HPV সহ যৌন বাহিত সবগুলো রোগ প্রতিরোধের জন্য কতিপয় করণীয় রয়েছে। তবে শুধুমাত্র HPV প্রতিরোধের জন্য সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী একটি পদ্ধতি হলো টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণ করা। সারাবিশ্বে নারী পুরুষ উভয়ের জন্য বিনামূল্যে HPV ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা রয়েছে যা ১১ থেকে ১২ বছর বয়সের মধ্যে গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ যদি আগে থেকে এই ভ্যাকসিন নিয়ে না‌ থাকে তবে সর্বোচ্চ ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত ভ্যাকসিন নেওয়া যাবে।‌ ভ্যাকসিন গ্রহণ সম্পর্কিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলোঃ

  • ১৫ বছরের আগে ভ্যাকসিন গ্রহণ করলে ২ ডোজ নিতে হবে এবং দুই ডোজের মধ্যবর্তী দূরত্ব ৬ মাস হওয়া উচিত
  • ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে টিকা নিলে সেক্ষেত্রে ৩ ডোজ টিকা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ১ম ডোজের ২ মাস পর ২য় ডোজ এবং ১ম ডোজের ৫ মাস পর ৩য় ডোজ নিতে হবে
  • একবার দেহে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটলে তারপর ভ্যাকসিন নিলে তা কার্যকরী হয় না। আর তাই যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আগেই অর্থাৎ সবার জন্য ১১ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা উচিত

 

৬. Hepatitis A

হেপাটাইটিস এ (Hepatitis A) রোগটি হলো ভাইরাস জনিত সংক্রমণ যে ভাইরাসের নাম হলো hepatitis A virus (HAV)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী সারাবিশ্বে প্রতিবছর ১.৪ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে সংক্রমিত হয়ে থাকে। (Santos-Longhurst, 2020) হেপাটাইটিস এ রোগের ভাইরাসের বাহক হচ্ছে মানুষ অর্থাৎ এই ভাইরাস মানুষের শরীরে অবস্থান করে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সুস্থ মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই পদ্ধতিতে সরাসরি ছড়িয়ে পড়া ছাড়াও আক্রান্ত ব্যক্তির দেহ থেকে ভাইরাসটি খাদ্য, পানি ও পায়খানার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

 

হেপাটাইটিস এ রোগের লক্ষণ | Symptoms of Hepatitis A in Bengali

হেপাটাইটিস এ এর প্রধান আক্রমণ স্থান হলো লিভার (Liver) যেখানে প্রদাহের সৃষ্টি করে থাকে। এক্ষেত্রে সৃষ্ট লক্ষণ সমূহ হলো:

  • দুর্বলতা ও ক্লান্তি
  • মাংসপেশীতে ব্যথা
  • ক্ষুধা কমে যায়
  • জন্ডিস (ত্বক ও চোখ হলুদ বর্ণের হয়ে থাকে)
  • সারা শরীরে চুলকানি
  • প্রস্রাব ও পায়খানা কালচে বর্ণের ইত্যাদি

 

হেপাটাইটিস এ রোগের চিকিৎসা | Treatment of Hepatitis A in Bengali

হেপাটাইটিস এ এর জন্য বিশেষ কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে না এবং তুলনামূলকভাবে এর জটিলতা বেশ কম। এই রোগের লক্ষণ দেখা দিলে ব্যথা ও জ্বর নাশক ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। সেই সাথে কয়েকটি স্বাস্থ্য টিপস মেনে চলা জরুরি। যেমনঃ

  • বিশ্রামে থাকতে হবে
  • আর্দ্র ও স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে বসবাস করা যাবে না
  • মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে তা পরিত্যাগ করা উচিত
  • সহজপাচ্য খাবার খেতে হবে
  • ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে
  • স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা আবশ্যক

 

৭. Hepatitis B

হেপাটাইটিস বি রোগের লক্ষণ

হেপাটাইটিস বি রোগের লক্ষণ

হেপাটাইটিস এ এর তুলনায় হেপাটাইটিস বি জটিল প্রকৃতির যার ভাইরাসের নাম হলো hepatitis B virus (HBV)। এই ভাইরাসের বাহক হলো মানুষের শরীর যার ফলে আক্রান্ত রোগীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়ে। সেই সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত সুচ সিরিঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়াও গর্ভবতী মায়ের মাধ্যমে শিশুর শরীরে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

 

হেপাটাইটিস বি রোগের লক্ষণ | Symptoms of Hepatitis B in Bengali

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না কিন্তু হঠাৎ পরীক্ষা করে দেখা যায় যে পজিটিভ অর্থাৎ হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত। তবে কারো কারো বেলায় নিম্নলিখিত লক্ষণ দেখা যেতে পারে। যেমনঃ

  • বমি বমি ভাব ও বমি
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া
  • পেটে ব্যথা
  • ডায়রিয়া
  • দুর্বলতা বোধ
  • দীর্ঘদিন যাবত হালকা জ্বর
  • জন্ডিস ইত্যাদি

 

উল্লেখ্য

হেপাটাইটিস বি রোগটির একটি লক্ষণ হলো জন্ডিস আর জন্ডিস বলতে বোঝানো হয় রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। সুস্থ অবস্থায় শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় লিভার থেকে সামান্য পরিমাণে বিলিরুবিন নিংসরণ হয়ে থাকে তবে অসুস্থ্য অবস্থায় লিভার থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে বিলিরুবিন নিঃসরণ হয় যার ফলে ত্বক ও চোখ হলুদ বর্ণের হয়ে যায়। লিভারের অসুস্থতার কারণ যদি হয়ে থাকে হেপাটাইটিস (এ, বি) ভাইরাস তখনকার জন্ডিসকে STDs জন্ডিস বলা যাবে। তবে হেপাটাইটিস ভাইরাসের সংক্রমণ ছাড়াও নানাবিধ কারণে লিভারের সমস্যা হতে পারে এবং জন্ডিস দেখা যায় কিন্তু সেই জন্ডিস STDs বলে বিবেচিত হবে না।

 

হেপাটাইটিস বি রোগের চিকিৎসা | Treatment of Hepatitis B in Bengali

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা গ্রহণ করলে বেশ সুস্থ থাকা যায়। তবে চিকিৎসা গ্রহণে দেরি হলে সেক্ষেত্রে ভাইরাসের বৃদ্ধি দমন করার মাধ্যমে লিভারের ক্ষতিগ্রস্ততা যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকে। চিকিৎসা গ্রহণের জন্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অথবা লিভারের রোগ বিশেষজ্ঞ (Hepatologist) চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

 

হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত রোগীদের জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা না হলে একসময়ে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার এর মতো জটিল রোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তাই যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে এবং সুস্থ মানুষের জন্য হেপাটাইটিস বি এর টিকা (Hepatitis B Vaccine) গ্রহণ করা জরুরি।

 

যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ করার উপায় কি?

যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ করার উপায়

যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ করার উপায়

উপরে উল্লেখিত প্রায় সবগুলো যৌন বাহিত রোগ বা STDs এর ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো লক্ষণীয় তা হলো:

  • অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণ প্রকাশ পায় না
  • লক্ষণ প্রকাশ পেলেও তা বুঝতে পারা বেশ কঠিন কারণ অন্যান্য অনেক রোগের লক্ষণের সাথে তা মিলে যায়
  • সবগুলোর জন্য কার্যকরী চিকিৎসা নেই যা সম্পূর্ণভাবে সুস্থ করে তুলতে পারে

আর তাই যৌন বাহিত রোগ যেনো সংক্রমণ ঘটাতে না‌ পারে সেই জন্য প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কার্যকরী উপায় সমূহ হলোঃ

✓ যৌন সঙ্গী/সঙ্গীনির সাথে নিরাপদ উপায়ে যৌন মিলন করতে হবে

✓ স্বামী স্ত্রী দুজনের জন্যই আগে থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে যে কেউই STDs এ আক্রান্ত নয়

✓ যদি একজন আক্রান্ত হয় তবে পুরুষের জন্য কনডম ব্যবহার করতে হবে। কনডম ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে ভুল গুলো এড়াতে হবে তা হলোঃ

  • কনডমের প্যাকেট কাঁচি দিয়ে কাঁটা যাবে না কারণ তাতে কনডম কেটে যেতে পারে অথচ আপনি টের পাবেন না
  • অতিরিক্ত প্রটেকশন ভেবে একইসাথে দুইটি কনডম ব্যবহার করা যাবে না। কারণ তাতে কনডম ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে

 

✓ গর্ভধারণের আগে STDs এর পরীক্ষা করতে হবে

✓ পরীক্ষায় রোগ ধরা পড়লে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণের পর একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভধারণ করতে হবে

✓ আপনি যদি ইতিমধ্যেই গর্ভধারণ করে থাকেন তবে যত দ্রুত সম্ভব পরীক্ষা করুন

✓ যেই সমস্ত যৌন বাহিত রোগের ভ্যাকসিন রয়েছে সেগুলোর জন্য যথাসময়ে ভ্যাকসিন গ্রহণ করুন

✓ সর্বোপরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি

 

প্রস্রাবে ইনফেকশন কি যৌন বাহিত রোগ? (STDs vs UTI)

ক্ল্যামিডিয়া ও গনোরিয়ার লক্ষণগুলো জানার পর অনেকেই হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন যে আপনার শরীরে এই রোগের সংক্রমণ হয়েছে কারণ প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হয়। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার সবচেয়ে কমন কারণ হলো প্রস্রাবের ইনফেকশন বা UTI (urinary tract infection) যার লক্ষণের সাথে ক্ল্যামিডিয়া ও গনোরিয়ার লক্ষণের মিল রয়েছে।

তবে এটি (UTI) সম্পূর্ণ আলাদা একটি রোগ যা ব্যাকটেরিয়ার (Escherichia coli.) সংক্রমণের ফলে ঘটে থাকে। এটি যৌন বাহিত রোগ (STDs) নয় বরং এর সংক্রমণ হয়ে থাকে প্রস্রাবের অঙ্গ গুলোতে। যেমনঃ কিডনি, মুত্রথলি, মুত্রনালী ইত্যাদি। এক্ষেত্রে প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ হওয়া যায়।

যৌন বাহিত রোগের লক্ষণ দেখা দিলে লজ্জা না করে বরং যত দ্রুত সম্ভব একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। লক্ষণ ছাড়াও যদি অসাবধানতাবশত কোন কর্মকাণ্ডের জন্য মনে হয় যে যৌন বাহিত রোগের সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে তবে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে পারেন। পরীক্ষায় রোগ (STDs) ধরা পড়লে যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করুন আর সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য নির্দেশনা হলো যৌন বাহিত রোগ প্রতিরোধের উপায় সমূহ মেনে চলুন।

 

 

References

Brazier, Y. (2020, August 7). Symptoms, causes, and treatment of herpes. From Medical NEWS Today : https://www.medicalnewstoday.com/articles/151739

Gabbey, A. E. (2015, February 21). Everything you Need to Know About Human Papillomavirus Infection. From Healthline: https://www.healthline.com/health/human-papillomavirus-infection#_noHeaderPrefixedContent

Johnson, S. (2019, March 26). Syphilis. From Healthline: https://www.healthline.com/health/std/syphilis

Santos-Longhurst, A. (2020, November 4). Signs and Symptoms of Common STDs in Men. From Healthline: https://www.healthline.com/health/mens-health-signs-of-common-stds#hepatitis-b

WHO. (2021, November 22). Sexually transmitted infections (STIs). From World Health Organization: https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/sexually-transmitted-infections-(stis)

 

 

Last Updated on July 25, 2022

Was this article helpful?
YesNo