টিবি বা যক্ষা রোগ সম্পর্কে আপনার যা জানা দরকার। টিবি বা যক্ষা রোগ  নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা -নিরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিকভাবে লসিকাগ্রন্থি ও স্টেথোস্কোপ দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এটি পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। এছাড়াও কিছু ল্যাবরেটরি টেস্ট করা হয়। চলুন তাহলে জানা যাক কিভাবে যক্ষা বা টিবি রোগ পরীক্ষা করা হয়?

ম্যানটক্স টিউবারকুলিন স্কিন টেস্ট (টিএসটি)/Mantoux tuberculin skin test (TST)

হাতের সবচেয়ে উপরের অংশের ত্বকে অল্প পরিমাণে টিউবারকুলিন (Tuberculin), ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয়। ইনজেকশন দেয়ার ৪৮-৭২ ঘন্টা পর্যন্ত রোগীকে পর্যবেক্ষনে রাখা হয়। এই সময়ের মধ্যে স্কিনে কিছু পরিবর্তন ঘটে (যেমন ইনজেকশন যেখানে দেয়া হয় তার আশেপাশে ছোট ছোট ফ্যাকাশে রঙের ফুসকুড়ি উঠে, ইনজেকশানের জায়গাটুকু ৫মিলিমিটার এর বেশি ফুলে উঠলে) যা দেখে ডাক্তার নিশ্চিত হন রোগীর শরীরে টিবির জীবাণুর উপস্থিতি আছে।

রক্ত পরীক্ষা (Blood Test)

রক্ত পরীক্ষার বা Blood Test মাধ্যমে দেহে সুপ্ত এবং সক্রিয় যক্ষার অবস্থান নির্ণয় করা যায়, এছাড়াও এ রোগের প্রতি দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার (Immune system) কার্যকলাপ সম্পর্কে জানা যায়।

রোগ নির্ণয়ের জন্য ২ টি রক্ত পরীক্ষা করা হয় –

১. টি-স্পট টিবি পরীক্ষা (টি-স্পট)/T-SPOT TB test (T-Spot)

২. কোয়ান্টিফেরন-টিবি গোল্ড ইন-টিউব পরীক্ষা (কিউএফটি-জিআইটি)/QuantiFERON-TB Gold In-Tube test (QFT-GIT)

আরো পড়ুন : টিবি রোগ কি? টিবি বা যক্ষ্মা রোগের লক্ষণ কি?

রক্ত পরীক্ষার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে টিবিকে পজিটিভ, নেগেটিভ ও ইনডিটারমাইন এই ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। ব্লাড টেস্ট পজিটিভ মানে শরীরে টিবির জীবাণু রয়েছে, নেগেটিভ বলতে জীবাণু নেই এবং ইনডিটারমাইন বলতে জীবাণু আছে তবে সুপ্ত অবস্থায়।

  • এক্স-রে

স্কিন ও রক্ত পরীক্ষা পজিটিভ আসলে বুকের একটি এক্স-রে করতে হয়। বুকের এক্স-রের মাধ্যমে দেখা হয় ফুসফুসে ছোট ছোট কোন দাগ আছে কিনা যা শরীরে টিবির উপস্থিতি নির্দেশ করে।

বুকের এক্স-রে যদি নেগেটিভ হয়, তাহলে বুঝতে হবে টিবি সুপ্ত অবস্থায় আছে অথবা স্কিন বা রক্ত পরিক্ষায় কোন ভুল রিপোর্ট এসেছিল। এর জন্য প্রয়োজনে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরো কিছু বাড়তি টেস্ট করা লাগতে পারে।

  • কফ পরীক্ষা

কফ হল শ্লেষ্মা যা কাশির সময় উঠে আসে। কফ পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ নির্ণয় করা যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রায় সময়ই স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়িতে এসে কফ সংগ্রহ করে নিয়ে যায় পরীক্ষা করার জন্য।

  • এছাড়াও রোগ নির্ণয়ের জন্য সিটি স্ক্যান (CT scan), ব্রঙ্কোসকপি (Bronchoscopy), ফুসফুসের বায়োপসি (Lung biopsy) করা হয়।

টিবি রোগের চিকিৎসা

উপসর্গ না থাকলেও সুপ্ত টিবির চিকিৎসা করা জরুরি। কারণ ভবিষ্যতে রোগ বিকাশ পেতে পারে। সুপ্ত টিবির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র একটি ওষুধের প্রয়োজন হয়। তবে সক্রিয় টিবির ক্ষেত্রে বেশ কিছু ওষূধ খেতে হয়।

টিবির ওষূধগুলো কমপক্ষে ৬ মাস বা তার বেশি সময় ধরে সেবন করতে হয়।

টিবি রোগের ঔষধ কি?

এ রোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বব্যাপী নিমোক্ত ওষূধগুলো ব্যবহার করা হয়-

  • আইসোনায়াজিড (Isoniazid)
  • রিফামপিসিন (Rifampicin)
  • ইথামবিউটল (Ethumbutol)
  • পাইরাজিনামাইড (Pyrazinamide)

 

টিবি রোগের ঔষধ কি

টিবি রোগের ঔষধ কি?

যক্ষার ওষুধ খাওয়ার পদ্ধতিকে বলা হয় Directly observe therapy (DOT) । মানে ওষুধগুলো একজন স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে খেতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এই ওষুধ সেবন করতে হয় বলে অনেক সময় ডোজ মিস হয়ে যেতে পারে বা অনেকে একটু উপকার পেয়েই মনে করতে পারেন যে তার রোগ ভাল হয়ে গেছে। তাই সর্বাধিক সতর্কতা অবলম্বনে ওষুধ একজন স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে সেবন করতে হয়।

তবে আপনি যদি কোন স্বাস্থ্য কর্মীর তত্ত্বাবধানে না থাকেন তাহলে অবশ্যই ওষুধ সেবনের একটি রুটিন তৈরি করে সেটা মেনে চলুন। কারন ডোজ মিস হয়ে গেলে যক্ষা তো ভাল হবেই না, উল্টো ওষুধ তার কার্যকরিতা হারাবে।

সঠিক সময়ে ওষুধ সেবন করার জন্য কিছু কার্যকরী টিপস-

  • প্রতিদিন একই সময়ে ওষুধ সেবন করুন/ মোবাইলে এলার্ম সেট করে রাখুন
  • ক্যালেন্ডারে ওষুধ খাওয়ার দিন গুলো দাগ কেটে রাখুন এবং নিয়মিত ফলো করুন
  • কাউকে মনে করিয়ে দিতে বলুন প্রতিদিন
  • ওষুধগুলো এমন স্থানে রাখুন যাতে উঠতে-বসতে চোখে পরে

যক্ষা রোগ কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?

টিবি রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির আশেপাশে থাকলে এ রোগ প্রতিরোধ করা কঠিন। যেসব অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি সেখানকার বেশিরভাগ মানুষই যক্ষার টিকা নিয়ে থাকে। টিবি ভ্যাক্সিনের নাম হল ভিসিজি (Bacillus Calmette-Guerin; BCG) টিকা। যদিও এটি পুরোপুরিভাবে যক্ষা প্রতিরোধ করতে পারে না।

টিবি হতে রক্ষার কিছু কৌশল –

  • আক্রান্ত ব্যাক্তি হতে দূরে থাকা
  • মাস্ক পরিধান করা
  • থাকার রুমে পর্যাপ্ত বাতাস প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকা
  • গণসচেতনা সৃষ্টি করা

বাংলাদেশে যক্ষ্মার চিকিৎসা

আমাদের দেশে প্রতিদিন গড়ে ৯৭৮ জন লোক যক্ষায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন ১২৯ জন। এদের মধ্য গড়ে ১৬ জনের শরীরে যক্ষার ওষুধ রেসিসটেন্ট হয়ে গেছে, মানে তাদের শরীরে যক্ষার ওষুধ কোন কাজ করছে না (BBC, 2020)

দেশের সকল সরকারি জেলা হাসপাতাল, স্বাস্থ্য ক্লিনিক ও উপজেলা হাসপাতালে যক্ষার চিকিৎসা বিনামূল্য দেয়া হয়। যদিও বলা হয়ে থাকে যক্ষার চিকিৎসা সম্পূর্ন ফ্রি। তবে বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। ফ্রি বলতে এখানে শুধু ওষুধ ও কাশি পরীক্ষা করা কে বলা হয়েছে। অন্যান্য ব্যয়বহুল পরীক্ষা যেমন সিটি স্ক্যান, এক্সরে, বায়োপসি ইত্যাদি পরীক্ষা বিনামূল্যে দেয়া হয় না।

বাংলাদেশের যক্ষা বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো হল


 

Last Updated on December 29, 2022

Was this article helpful?
YesNo