ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ (NIH of US) এর তথ্য অনুযায়ী সারাবিশ্বে প্রায় ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের ভিটামিন ডি এর অভাব রয়েছে। যার কারণ হিসেবে নগরায়ন ও আধুনিক জীবন যাপন পদ্ধতি অনেকটাই দায়ী। ভিটামিন ডি (vitamin D) এর অভাবে শরীরে নানাধরনের জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে যা শুধু হাড় ও দাঁতের সমস্যাতেই সীমাবদ্ধ নয়। কিভাবে এর অভাব সৃষ্টি হয়, অভাব জনিত কি কি জটিলতা হতে পারে ও অভাব পূরণে করণীয় বিষয়াবলী সম্পর্কে এই অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে। ভিটামিন ডি সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য সমৃদ্ধ এই অনুচ্ছেদ পাঠের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি ও সুস্থ্য জীবন যাপন করা সম্ভবপর হবে।

ভিটামিন ডি কি এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভিটামিন ডি কি এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ

 

ভিটামিন ডি সম্পর্কে জানার পূর্বে ভিটামিন কি এবং কেন শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সে সম্পর্কে জানা দরকার। খাদ্যের ৭ টি প্রয়োজনীয় উপাদানের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হলো ভিটামিন। যা দেহের নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। ভিটামিন মূলত দুই ধরনের। যথা:

১। পানিতে দ্রবনীয় ভিটামিন যা শরীরের মধ্যে বেশি সময় পর্যন্ত জমা থাকে না। তাই এই জাতীয় ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার প্রতিদিন গ্রহণ করা উচিত। যেমন: ভিটামিন বি ও ভিটামিন সি।

২। চর্বিতে দ্রবনীয় ভিটামিন যা শরীরের মধ্যে জমা থাকে। এই জাতীয় ভিটামিন হলো চারটি। যথা: ভিটামিন এ, ডি, ই, কে।

এই অনুচ্ছেদে আমরা শুধু মাত্র ভিটামিন ডি নিয়ে আলোচনা করব যা অন্যান্য ভিটামিনের তুলনায় কিছুটা আলাদা প্রকৃতির তবে শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এটি সরাসরি খাবার থেকে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় না।
প্রায় ৯০ শতাংশ সূর্যের তাপের সহায়তায় শরীরে উৎপন্ন হয়, আর মাত্র ‌১০ শতাংশ খাবার গ্রহণের মাধ্যমে পাওয়া যায়।
শরীরে এই ভিটামিন যথেষ্ট পরিমাণে উৎপন্ন হওয়ার জন্য সূর্যের তাপ বিশেষ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

শারীরবৃত্তীয় (physiological) নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে ভিটামিন ডি। আবার এর অভাব জনিত কারণে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়সের সকল মানুষের শরীরে দেখা দিতে পারে নানাবিধ সমস্যা। মহামারী করোনা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বেলায় রয়েছে এই ভিটামিনের কার্যকারিতা।‌ তাই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা এড়াতে ব্যাতিক্রমী এবং গুরুত্বপূর্ণ এই ভিটামিন ডি সম্পর্কে সকলেরই প্রয়োজনীয় জ্ঞান রাখা উচিত।

 

ভিটামিন ডি এর উপকারিতা

শরীরের যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১। অন্ত্রের মাধ্যমে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণ করে এবং রক্তে এদের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আর এই উপাদান দুটি (calcium and phosphorus) দাঁত ও হাড়ের গঠন, হাড়ের সঠিক ঘনত্ব বজায় রাখা ও হাড়ের ভঙ্গুরতা প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। সেই সাথে মাংস পেশীর সঠিক গঠনেও ভিটামিন ডি কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

২। শরীরে দুই ধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। জন্মগতভাবে পাওয়া (innate system) ও পরবর্তী সময়ে অর্জিত (adaptive system) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যা মানুষের শরীরে ইনফেকশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং শরীরে এন্টিবডি তৈরি করে। এই দুই প্রকারের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ভিটামিন ডি সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়াও এটি বিভিন্ন জটিল প্রকৃতির রোগ (autoimmune disease) প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে থাকে।

৩। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে যাদের শরীরে কখনো vitamin D এর অভাব/ঘাটতি দেখা যায় নি তাদের হার্টের রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। কারণ হার্টের বিভিন্ন রোগ যেমন হার্ট এ্যাটাক (myocardial infarction) ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে এটি সহায়তা করে।

৪। বিভিন্ন বয়সের ১৫৯ জন পুরুষ ও ২৮২ জন মহিলার উপরে দীর্ঘ ১ বছর যাবত পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে যাদের শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে vitamin D রয়েছে তারা বিষণ্ণতায় কম ভুগেছেন। কারণ দুশ্চিন্তা ও বিষন্নতা কমাতে এটি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।

৫। যারা শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন তাদের জন্য ভিটামিন ডি বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষত এটি ক্ষুধার অনুভূতি কমাতে সহায়তা করে যা ওজন কমানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

৬। টেস্টোস্টেরন (testosterone) বৃদ্ধিতে সহায়তা করে যা পুরুষের স্বাভাবিক যৌন জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হরমোন। এছাড়াও শুক্রাণুর গুনাগুণ (sperm quality) বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে যা সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য প্রয়োজন।

৭। ক্যান্সার প্রতিরোধে vitamin D কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে কি না তা জানতে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছেন। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যাদের শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি নেই তাদের কোলন ক্যান্সার (colorectal cancer) হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। তবে কিভাবে কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে সে ব্যাপারে এখনো গবেষণা বিদ্যমান রয়েছে।

 

ভিটামিন ডি এর অভাবে কি হয়?

যাদের শরীরে সূর্যের তাপ না লাগে অথবা যারা নিরামিষ আহার (Vegetarian) করেন তাদের ক্ষেত্রে শরীরে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি বেশি দেখা দেয়। ঘাটতি হলে শরীরে নানাধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়। ভিটামিন ডি এর অভাবের লক্ষণ সমূহ নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

১। ভিটামিন ডি এর অভাব থাকলে সেক্ষেত্রে শরীর‌ যথাযথ ভাবে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণ করতে সক্ষম হয় না। বরং তা কিডনির মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের অভাবে হাড় ও দাঁতের গঠনে বিঘ্ন ঘটে। হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় যা হাড় ক্ষয়ে যাওয়া ও হাড়ের ভঙ্গুরতা বৃদ্ধি করে।

২। প্রাণঘাতী হৃদরোগ যেমন হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকি পর্যন্ত বেড়ে যায়।

৩। ভিটামিন ডি এর অভাব অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন নিঃসরণ কমিয়ে দেওয়া ও ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়ার সাথে সম্পর্কিত।

৪। Vitamin D এর অভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। যার ফলে সহজেই ইনফেকশন অথবা রোগের আক্রমণ ঘটে থাকে।

৫। কিছু বিশেষ ধরনের ক্যান্সার যেমন কোলন ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার ও প্রস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

৬। International Journal of Molecular Sciences এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ভিটামিন ডি এর অভাব অতিরিক্ত চুল পড়া এবং মাথায় টাক হওয়ার কারণ হতে পারে।

৭। রক্তে vitamin D এর লেভেল কমে যাওয়া বিষন্নতা সৃষ্টি করে এবং বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে তা জটিল প্রকৃতির মানসিক রোগের (schizophrenia) কারণ হতে পারে।

৮। ভিটামিন ডি এর অভাব অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার (obesity) কারণ হতে পারে।

৯। গর্ভকালীন সময়ে vitamin D এর অভাব জনিত কারণে শিশু কম ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে, এছাড়াও হাড়ের বিকৃতি এবং সময়ের আগেই প্রসব হতে পারে। এছাড়াও গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের (gestational diabetes) ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 

ভিটামিন ডি এর উৎস এবং কিসে পাওয়া যায়?

ভিটামিন ডি এর উৎস

 

ভিটামিন ডি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি উপাদান যার অভাবে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে যা উপরের আলোচনায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। আর তাই এই ভিটামিনের অভাব পূরণে এর প্রধান উৎস সূর্য থেকে কিভাবে ভিটামিন পাওয়া যায় এবং সে ক্ষেত্রে কি কি প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে সে বিষয়ে নিচে আলোচনা করা হলো।

 

Vitamin D কে sunshine vitamin বলা হয় কারণ এটির প্রধান উৎস হলো সূর্যের তাপ। যখন সূর্যের তাপ ত্বকে লাগে তখন শরীরের অভ্যন্তরীণ কলায় (tissue) এই ভিটামিন উৎপাদন হতে থাকে। তবে এক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নির্দেশনা ও সতর্কতা রয়েছে। যেমন:

  • দিনের প্রথম ভাগের সূর্যের তাপ সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। তাই দিনের প্রথমার্ধে রোদ পোহানো উচিত।
  • রোদ পোহানোর সময় অধিক রোদ চোখের জন্য যন্ত্রণাদায়ক বা ক্ষতিকর হতে পারে। এই সমস্যা প্রতিরোধে সানগ্লাস ব্যবহার করা উচিত।
  • রোদে থাকলে শরীরে ঘাম হবে যা পানি স্বল্পতার সৃষ্টি করতে পারে। আর তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করে নিতে হবে।
  • কাপড় দ্বারা সারা শরীর ঢেকে নয় বরং শরীরের যতটুকু অংশ সম্ভব অনাবৃত রেখে রোদ পোহাতে হবে।
  • সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করে রোদে থাকলে সে ক্ষেত্রে সূর্যের তাপ ভিটামিন ডি উৎপাদনে ফলপ্রসূ হবে না।

 

মোটকথা ভিটামিন ডি উৎপাদনের জন্য শরীরের ত্বকে সরাসরি সূর্য রশ্মি লাগানো প্রয়োজন। তবে সূর্যের তাপে দীর্ঘসময় থাকা যেমন কষ্টকর তেমনি তা ত্বকের জন্যও ক্ষতিকর। এমনকি সূর্য রশ্মি (UV rays) ত্বকের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত রোদে থাকা উচিত হবে না। দৈনিক ১০ থেকে ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে ৩ দিন রোদ পোহানো শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট। তবে কালো বর্ণের মানুষের জন্য আরেকটু বেশি সময় ধরে রোদে থাকা উচিত। কারণ কালো বর্ণের মানুষের ত্বকে তুলনামূলক বেশি পরিমাণে মেলানিন (melanin) থাকে। আর মেলানিন এমন এক ধরনের উপাদান যা রোদের তাপে ভিটামিন ডি উৎপাদনের গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়। (Raman, 2018)

 

ভিটামিন ডি কি কি খাবারে আছে?

সূর্য রশ্মি ভিটামিন ডি উৎপাদনের জন্য প্রধান উৎস হলেও এটিই একমাত্র উৎস নয়। কিছু কিছু খাবার রয়েছে যাতে এই ভিটামিন পাওয়া যায়। এমন কিছু খাবারের নাম নিচে দেওয়া হল।

  • বিভিন্ন ধরনের চর্বি যুক্ত মাছ (oily fish) যেমন স্যালমন, সার্ডিন, হেরিং এবং ম্যাকেরেল
  • কৌটাজাত টুনা মাছ
  • কড লিভার তেল
  • লাল মাংস
  • ডিমের কুসুম
  • গরুর দুধ
  • মাশরুম (Mushrooms)
  • কমলা লেবুর রস
  • শস্যদানা ইত্যাদি।

উপরোক্ত খাবার গুলো অনেকের জন্য আবার শরীরের অন্যান্য অংশের জটিলতা সৃষ্টির কারণ হতে পারে। যেমন লাল মাংস, ডিমের কুসুম ও বেশি বেশি সামুদ্রিক মাছ খেলে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে দুধ খেলে পেটে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তবে এই সমস্ত সমস্যা প্রতিকারের জন্য ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট (ওষুধ) গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই ডাক্তারের কিছু বিশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে।

ভিটামিন ডি বেশি খেলে কি হয়?

যারা দিনের সবটা সময় ধরে ঘরের মধ্যে অবস্থান করেন অর্থাৎ সূর্যের সংস্পর্শে আসা হয় না, অথবা যারা শীত প্রধান দেশে থাকেন যেখানে সূর্যের তাপ খুব দুর্লভ বস্তু তাদের জন্য ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।‌ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS of UK) এর তথ্য অনুযায়ী দৈনিক ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম। এক বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের জন্য এই মাত্রা হবে ৮.৫ মাইক্রোগ্রাম। উল্লেখ্য ১ মাইক্রোগ্রাম ১ মিলিগ্রামের ১০০০ ভাগের এক ভাগ।

প্রাপ্তবয়স্ক (১১ বছরের বেশি), গর্ভবতী মহিলা ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান
এমন মায়েদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ গ্রহণের মাত্রা কখনোই ১০০ মাইক্রোগ্রামের (4000 IU) বেশি হওয়া উচিত নয়।
১ থেকে ১০ বছরের মধ্যে এই মাত্রা সর্বোচ্চ ৫০ মাইক্রোগ্রাম (2000 IU) পর্যন্ত নিরাপদ।
আর ১ বছরের কম বয়সীদের জন্য প্রত্যেহ ২৫ মাইক্রোগ্রাম (1000 IU) পর্যন্ত প্রযোজ্য।
তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উল্লেখিত মাত্রার বাইরেও গ্রহণ করা যেতে পারে।

নির্দেশিত মাত্রার বাইরে অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরে নানাধরনের জটিলতার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে থাকলে শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম জমা হতে থাকে। যার ফলে হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া, কিডনি ও হার্টের নানাবিধ সমস্যা হতে পারে। উল্লেখ্য প্রাকৃতিক খাদ্য ও সূর্যের তাপ থেকে ভিটামিন উৎপাদনের ক্ষেত্রে কখনো অতিরিক্ততা বা বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয় না। তবে দীর্ঘসময় ধরে রোদে থাকার ফলে ত্বকের সমস্যা হয়ে থাকে।

 

ভিটামিন ডি ৩ এর উপকারিতা

ভিটামিন ডি চর্বিতে দ্রবনীয় একটি ভিটামিন যা calciferol নামেও পরিচিত। এটি মূলত দুটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত হয়।

  • Vitamin D2 (ergocalciferol)
  • ভিটামিন ডি৩ (কোলিক্যালসিফেরল)

Vitamin D3 পাওয়া যায় প্রাণীজ উৎস ও সূর্যের তাপ থেকে।
অপরদিকে Vitamin D2 পাওয়া যায় উদ্ভিজ্জ উৎস যেমন সূর্যের আলোতে জন্মানো মাশরুম ও বিভিন্ন ধরনের শস্যদানা থেকে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, রক্তে ভিটামিন ডি এর অভাব পূরণে vitamin D2 এর তুলনায় vitamin D3 বেশি কার্যকরী।

 

Vitamin D3 এর কিছু বিশেষ উপকারিতা নিচে উল্লেখ করা হলো।

  • শীতকালে বাচ্চাদের ইনফ্লুয়েঞ্জা (influenza A) থেকে সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
  • Vitamin D3 সাপ্লিমেন্ট চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই গ্রহণ করা যায়। এবং তা থাইরয়েডের সমস্যা (hypothyroidism) প্রতিকারে সহায়তা করে।
  • Vitamin D3 সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা নিরাপদ এবং তা দ্রুত কার্যকরী হয়।

ভিটামিন ডি ৩ এর অভাবে কি হয়?

ভিটামিন ডি ৩ এর অভাবে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে যা ভিটামিন ডি এর অভাব জনিত লক্ষণের প্রায় অনুরূপ। নিচে ভিটামিন ডি ৩ এর অভাবের লক্ষণ সমূহ তুলে ধরা হলো।

  • হাড়ের ঘনত্ব কমে যায় যার ফলে সহজেই হাড় ভেঙে যেতে পারে
  • হাড় ক্ষয়ে যাওয়া (osteoporosis) বিশেষত মহিলাদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়
  • মাংস পেশীতে ব্যথা অনুভব হতে পারে
  • অল্প পরিশ্রমেই শরীরে ক্লান্তি ভর করে
  • বাত ব্যথা হতে পারে (arthritis)
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় যার দরুন খুব সহজেই ইনফেকশন বা নিউমোনিয়া হতে দেখা যায়
  • চুল পড়া (hair falling)
  • মন খারাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষন্নতা দেখা যেতে পারে

 

ভিটামিন ডি ৩ এর অভাব কেন হয়?

দুধ না খাওয়া: দুধ একটি সুষম পুষ্টিকর খাবার যার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে vitamin D3 রয়েছে। কিন্তু অনেক মানুষের বেলায় দেখা যায় যে দুধ খেলে নানাবিধ সমস্যা হচ্ছে। বিশেষত যাদের পেটে দুধ হজমের জন্য প্রয়োজনীয় এনজাইমের অভাব থাকে তারা দুধ খেতে পারেন না। এটি একটি জন্মগত সমস্যার কারণে হতে পারে যা lactose intolerance রোগ নামে পরিচিত।

নিরামিষ আহার: প্রাণীজ আমিষ যেমন দুধ, ডিম, মাছ,‌ মাংস ইত্যাদি বর্জন করে শুধুমাত্র শর্করা ও শাকসবজি নির্ভর আহার করেন যারা তাদেরকে নিরামিষাশী (vegetarian) বলা হয়। নিরামিষ আহারের নানাবিধ উপকারিতা থাকলেও তা ভিটামিন ডি ৩ এর অভাবের কারণ হতে পারে। কেননা vitamin D3 প্রাণিজ আমিষ ব্যতীত অন্যান্য খাদ্য উপাদান থেকে পাওয়া যায় না।

 

সূর্যের তাপ: ভিটামিন ডি ৩ এর প্রধান উৎস হলো সূর্যের তাপ। সূর্যের তাপ সরাসরি ত্বকে লাগলে প্রাকৃতিক ভাবে এই ভিটামিন উৎপন্ন হয়। কিন্তু নগর জীবন যাপনের ক্ষেত্রে এবং অনেক শীতপ্রধান দেশেই নিয়মিত সূর্যের তাপের সংস্পর্শে আসা একটি বিরল ঘটনা। অধিকাংশ সময়েই বাড়ি, অফিস অথবা গাড়িতে অবস্থানের কারণে সূর্যের তাপ শরীরে লাগার সুযোগ পায়না।

 

কীভাবে ভিটামিন ডি ৩ এর অভাব প্রতিরোধ করবেন?

প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হলো অভাবের কারণ (যা উপরে বর্ণিত হয়েছে) খুঁজে বের করে তা অতিক্রম করা। যেমন:

  • দুধ খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।
    যাদের দুধ হজমে সমস্যা দেখা দেয় তাদের জন্য বিশেষ প্রকৃতির দুধ (lactose free) রয়েছে।
    যা সহজেই হজম হবে এবং vitamin D3 এর অভাব পূরণে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
  • বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সবসময় নিরামিষ আহার না করাই উত্তম।
    কেননা, আমিষ সহ সব ধরনের খাবার গ্রহণের মাধ্যমেই শরীর প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদান পেয়ে থাকে।
  • নিয়মিত অল্প কিছু সময় রোদের তাপ পোহানো উচিত।
    সূর্য যেমন পুরো পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেমনি তা মানব শরীরের উপরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

বাচ্চাদের জন্য ভিটামিন ডি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সব বয়সের মানুষের জন্য ভিটামিন ডি এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি।
কারণ তা শিশুর স্বাভাবিক গঠন ও বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে বিশেষত হাড় ও দাঁতের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
হাড় ও দাঁতের সঠিক গঠন এবং বৃদ্ধিতে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস এই দুই টি উপাদান অপরিহার্য।
খাবারের মাধ্যমে এই উপাদান গুলো শরীরে প্রবেশ করে।
কিন্তু ভিটামিন ডি এর সহায়তা ব্যতীত শরীরের মধ্যে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষিত (absorb) হতে পারে না অর্থাৎ শরীরের কোন উপকারে আসে না।
আর তখন এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দ্বয়ের ঘাটতির দরূন শিশুর দাঁত ও হাড়ের গঠনে বিকৃতি দেখা দেয়।

 

ভিটামিন ডি এর অভাবে শিশুদের কি রোগ হয়?

শিশুদের মধ্যে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হলে তাদের শরীরের যথাযথ গঠন ও সঠিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। বাচ্চাদের ভিটামিন ডি–এর অভাবের লক্ষণ ও উপসর্গ সমূহ নিম্নরূপ:

  • শরীরের হাড়ের ও মাথার খুলির গঠন সঠিক ভাবে হয় না
  • ক্ষেত্রবিশেষে হাড়ের বিকৃতি দেখা যেতে পারে যাকে রিকেটস (Rickets) বলা হয়
  • জন্মের পরপরই জন্ডিস দেখা দিতে পারে
  • দাঁত উঠতে বেশি সময় লাগে
  • শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়
  • শিশু বেঁটে প্রকৃতির হয়

 

বাচ্চাদের জন্য ভিটামিন ডি–এর সেরা খাবার 

 

বাচ্চাদের জন্য ভিটামিন ডি–এর সেরা খাবার 

যেহেতু এই ভিটামিনের প্রধান উৎস হলো সূর্যের তাপ। তাই শিশুদের সূর্যের তাপে মাঝে মধ্যে একটু ঘোরাঘুরি অথবা খেলাধুলা করতে দেওয়া উচিত। একদম জন্মের পরপরই অনেক বাচ্চার জন্ডিস (neonatal jaundice) দেখা দিতে পারে। সাধারণত এর জন্য কোন চিকিৎসার দরকার পড়ে না। সকাল বেলার হালকা রোদে কিছুক্ষণ বাচ্চাকে রোদ পোহানো এই সমস্যার সেরা সমাধান হতে পারে। শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধের মধ্যেই সব রকমের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে একটু বড় বাচ্চা যারা স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করে তাদের জন্য নিম্নলিখিত খাবার গুলো এই ভিটামিনের অভাব পূরনে সেরা খাবার

হতে পারে।

  • কুসুম সহ ডিম
  • ডিমের তৈরি মজাদার খাবার
  • গরুর দুধ
  • মাশরুম
  • কমলার রস
  • মাছ ইত্যাদি

 

করোনা প্রতিরোধে ভিটামিন ডি

যুক্তরাজ্যের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে ভিটামিন ডি ৩৪% পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে।
এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন প্রতিরোধে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
উপরন্তু করোনা কালীন সময়ে অনেকটা সময় ঘরেই অবস্থান করার ফলে সূর্যের তাপের অভাবে অনেকেই এই ভিটামিনের ঘাটতিতে আছেন।
তাই করোনা কালীন সময়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
তবে অবশ্যই তা নির্দেশিত নিরাপদ মাত্রায় সেবন করতে হবে।

শরীরের জন্য ভিটামিন ডি যেমন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে ঠিক তেমনি এর অভাব জনিত কারণে শরীরে নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হয়।
নগর জীবন যাপন পদ্ধতি সরাসরি সূর্যের তাপ শরীরে লাগার সম্ভাবনাকে করেছে ক্ষীণ।
কিন্তু শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান ভিটামিন ডি এর উৎপাদনের জন্য সূর্যের তাপ শরীরে লাগানো জরুরি।
আর তাই এই ব্যাপারে যথাযথ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের সকলেরই সোচ্চার হওয়া উচিত।

Last Updated on March 2, 2022

Was this article helpful?
YesNo