প্যারাসিটামল (paracetamol) অতি পরিচিত একটি ওষুধের নাম যা প্রদাহ নাশক হিসেবে সর্বাধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। আমাদের সবার ঘরেই প্রাথমিক চিকিৎসার উপকরণ হিসেবে প্যারাসিটামল রাখা হয় যা জ্বর ও ব্যথার প্রাথমিক অবস্থায় কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর অযাচিত ব্যবহার স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বিশেষত যকৃত (Liver) কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করণে এই ওষুধ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে হবে। এই অনুচ্ছেদে প্যারাসিটামলের ব্যবহার বিধি, সঠিক মাত্রা, ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সহ প্যারাসিটামল ব্যবহারে সচেতনতা বিষয়ক আলোচনা করা হয়েছে।

 

 

প্যারাসিটামল কি? ( What is Paracetamol)

প্যারাসিটামল কি

প্যারাসিটামল একটি জেনেরিক বা সাধারণ নাম যা অ্যাসিটামিনোফেন (acetaminophen) নামেও পরিচিত। সাধারণত ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিজেদের নির্বাচিত বাণিজ্যিক নামে (Trade name) প্যারাসিটামল উৎপাদন ও বাজারজাত করে থাকে। যেমন: নাপা, এইচ (Ace), প্যানাডল, রেনোভা ইত্যাদি। তবে বাণিজ্যিক নাম যাই হোক না কেনো মূল উপাদান প্যারাসিটামল হওয়া জরুরী।

এবার কথা বলা যাক ওষুধের ধরন নিয়ে।
প্যারাসিটামল একটি NSAID (Non steroidal anti-inflammatory drugs) গ্রুপের ওষুধ যা প্রদাহ নাশক হিসেবে কার্যকরী।
সেই সাথে এটি ওটিসি (OTC- over the counter) ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত ওষুধ যা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই কেনা ও ব্যবহার করা যায়।
তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার ও মাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকাটা জরুরী।

প্যারাসিটামল এর কাজ কি?

এবার জানা যাক এই ওষুধ কি দিয়ে তৈরি এবং কি ভাবে কাজ করে থাকে।
প্যারাসিটামল একটি রাসায়নিক উপাদান যা ফার্মাকোপিয়ার (রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত এবং প্রকাশিত সংকলন গ্রন্থ যাতে ওষুধ প্রস্তুতের জন্য সমস্ত কিছু লিপিবদ্ধ থাকে) নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়ে থাকে।
এর রয়েছে এন্টিপাইরেটিক (antipyretic) বা জ্বরনাশক ও এনালজেসিক (analgesic) বা ব্যথানাশক ধর্ম।
এটি জ্বর তথা শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা কমাতে সহায়তা করে।
আর এনালজেসিক ধর্মের কারণে এটি মৃদু থেকে মাঝারি প্রকৃতির ব্যথা কমাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
সাধারণত মাথা ব্যথা (headache), মাংস পেশীর ব্যথা, দাঁতে ব্যথা,‌ হাঁটু বা
শরীরের অন্যান্য জয়েন্টের ব্যথা সহ যে কোন ব্যথা উপশমে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে জ্বর বা ব্যথা যদি তীব্র মাত্রায় (severe) দেখা দেয় তবে সে ক্ষেত্রে শুধু প্যারাসিটামল এর উপর ভরসা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

প্যারাসিটামল কোন রোগের ওষুধ?

মুলত এটি একটি প্রাথমিক স্তরের ওষুধ যা সাধারণত জ্বর ও ব্যথার ওষুধ হিসেবে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬° ফারেনহাইট। সাধারণ প্রকৃতির জ্বর যেমন ঠান্ডা জনিত বা ভাইরাল জ্বর যে ক্ষেত্রে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ১০২° ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। সেই সাথে আনুসাঙ্গিক লক্ষণাবলী যেমন হাঁচি, ঠান্ডা, কাশি ও শরীরে ব্যথার অনুভূতি থাকলে প্যারাসিটামল উপশম দায়ক হিসেবে কাজ করে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ব্যথার প্রাথমিক স্তরের উপশম দায়ক হিসেবে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। যেমন:

 

১। মাথা ব্যথা: মৃদু প্রকৃতির মাইগ্রেইনের ব্যথা সহ ঠান্ডা জনিত বা জ্বরের কারণে উদ্ভূত মাথাব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

২। মাংস পেশী জয়েন্টে ব্যথা: অধিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের ফলে মাংস পেশীতে ব্যথা অনুভব হয় যা প্যারাসিটামল সেবন করার ফলে উপশম হয়ে থাকে। এছাড়াও শরীরের বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা বিশেষত অস্টিওআর্থ্রাইটিস (হাড়ের রোগ যা হাঁটুতে বেশি হয়) এর প্রাথমিক স্তরের ব্যথা নিরাময়ে সাহায্য করে।

৩। অন্যান্য: এছাড়াও যে কোন ধরনের মৃদু থেকে মাঝারি প্রকৃতির ব্যথা যেমন দাঁত ব্যথা, কানে হঠাৎ ব্যথা অনুভূত হওয়া, মহিলাদের পিরিয়ড এর ব্যথা (dysmenorrhea) ইত্যাদি কমাতে সহায়তা করে।

সব ধরনের জ্বরের জন্য শুধু প্যারাসিটামল নির্ভর চিকিৎসা নেওয়া বোকামি।
কেননা ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড, ডেঙ্গু সহ যে কোন ধরনের ইনফেকশন জনিত জ্বর এর ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় না।
এক্ষেত্রে বাসায় থেকে শুধু প্যারাসিটামল সেবন করতে থাকলে সুফল পাওয়া যায় না।

উপরন্তু রোগ সময়ের সাথে সাথে জটিল থেকে জটিলতর হতে পারে।
তাই এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
সাধারণ জ্বরের ক্ষেত্রে ৩ দিন একনাগাড়ে প্যারাসিটামল সেবনের ফলে জ্বর না কমলে বুঝতে হবে অন্য কোন জটিল সমস্যা হয়েছে।

উল্লেখ্য চিকিৎসক যদি জটিল রোগ ও শল্যচিকিৎসার পরবর্তী ওষুধের সাথে প্যারাসিটামল সেবনের নির্দেশনা দিয়ে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় তা সেবন করা যাবে।
অনেকের কাছেই মনে হতে পারে প্যারাসিটামল একটি প্রাথমিক স্তরের ওষুধ।
কিন্তু চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন জটিল রোগের ক্ষেত্রেও জ্বর এবং প্রদাহ নাশক হিসেবে প্যারাসিটামল ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

 

প্যারাসিটামল খাওয়ার নিয়ম

প্যারাসিটামল একটি ওটিসি মেডিসিন যা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সেবন করা যায়। আর সেখানেই ঘটে থাকে বিপত্তি যদি না ওষুধ খাওয়ার নিয়ম তথা ডোজ (dose) সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান থাকে। বয়স ভেদে ওষুধ সেবনের মাত্রায় তারতম্য রয়েছে। জ্বর বা ব্যথার তীব্রতা অনুযায়ী কখন, কোন মাত্রায় প্যারাসিটামল সেবন করলে তা নিরাপদ ও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে সে বিষয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো।

সাধারণত প্যারাসিটামল রোগ বা রোগের লক্ষণ দেখা দিলে প্রয়োজন মাফিক ব্যবহার করা হয়।
সেক্ষেত্রে রোগের উপশম হলে ওষুধ বন্ধ করা যাবে।
সর্বনিম্ন কোনো মাত্রা নির্ধারণ করা নেই। তবে সর্বোচ্চ কত মাত্রায় প্যারাসিটামল গ্রহণ করা যাবে সে ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে।
সাধারণত একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ ২৪ ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৪ গ্রাম (4000 mg) পর্যন্ত প্যারাসিটামল গ্রহণ করতে পারে।
তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই প্রতিবারে সর্বোচ্চ ১ গ্রাম (1000 mg) করে দিনে ৪ বার ওষুধ সেবন করতে হবে।
ওষুধ সেবনের অন্তর্বর্তী দূরত্ব সর্বনিম্ন ৪ ঘন্টা হতে হবে। তবে যাদের লিভারের সমস্যা আছে বা মদ্যপানের অভ্যাস রয়েছে তাদের বেলায় সর্বোচ্চ ২ গ্রাম (2000 mg) পর্যন্ত নিরাপদ।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের বেলায় অবশ্যই কম মাত্রায় ওষুধ সেবন করতে হবে। ৬ বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য প্যারাসিটামল সিরাপ প্রযোজ্য। প্রতি বারে ৫মিলি পরিমাণে সেব্য যাতে রয়েছে 120mg প্যারাসিটামল এবং দিনে সর্বোচ্চ ৪ বার । আর ৬ বছরের বেশি বাচ্চাদের বেলায় প্রতিবারে 250mg পরিমাণে দিনে সর্বোচ্চ ৪ বার সর্বনিম্ন ৪ ঘন্টা অন্তর অন্তর সেবন করা যায়। ২ বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য ডাক্তারের নির্দেশনা ব্যতীত ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।

প্যারাসিটামল খালি পেটে সেবন করা যায় তবে খালি পেটে সেবন না করাই উত্তম। কেননা প্যারাসিটামল সেবনের ফলে পাকস্থলীতে এসিড জমা হয় যা খালি পেটে পাকস্থলীতে ক্ষত (ulcer) সৃষ্টি করতে পারে। (Guh, 2018, p. 343) ওষুধ চলাকালীন সময়ে কোনো ডোজ ভুলে গেলে সেক্ষেত্রে মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া যাবে। তবে সেটা যদি পরবর্তী ওষুধ খাওয়ার সময় মনে হয় সেক্ষেত্রে আগের টা সহ দুই ডোজ একসাথে খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং দুই ডোজ একসাথে খেলে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

প্যারাসিটামল বেশি খেলে কি হয়?

প্যারাসিটামল প্রদাহ নাশক হিসেবে কার্যকরী ও উপকারী একটি ওষুধ। তবে তা অবশ্যই বয়স ও রোগের তীব্রতা অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় সেবন করতে হবে। বেশি মাত্রায় (overdose) সেবন করলে উপকারের পরিবর্তে তা শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক সময় মানুষ অজ্ঞতা বশত বেশি পরিমাণে প্যারাসিটামল গ্রহণ করে থাকে। বিশেষত অন্যান্য ওষুধের সাথে এটি গ্রহণের সময় এমনটি হতে পারে যদি সেই সহযোগী ওষুধের মধ্যেও প্যারাসিটামল উপাদান টি বিদ্যমান থাকে। এছাড়াও একই সময়ে বেশি পরিমাণে (>1000mg) খাওয়া অথবা দুই ডোজের অন্তর্বর্তী সময় ৪ ঘন্টার কম হওয়া ওভার ডোজের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্যারাসিটামল বেশি খেলে কি হয়

 

এফডিএ এর (FDA- U.S. Food and Drug Administration) তথ্য অনুযায়ী, অধিক পরিমাণে প্যারাসিটামল গ্রহণের ফলে লিভার (Liver) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দৈনিক সর্বোচ্চ গ্রহণের মাত্রা 4000mg নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যাদের আগে থেকেই লিভারের রোগ বা মদ্যপানের অভ্যাস রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এই মাত্রা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাদের বেলায় সর্বোচ্চ 2000mg পর্যন্ত নিরাপদ বলে মনে করা হয়। প্যারাসিটামল বেশি পরিমাণে খাওয়ার ফলে (overdose) যে সমস্ত লক্ষণাবলী প্রকাশিত হতে পারে তা নিম্নরূপ।

  • বমি বমি ভাব অথবা বমি হওয়া
  • ক্ষুধা মন্দা দেখা দিতে পারে
  • পেটে ব্যথা অনুভূত হতে পারে বিশেষত পাকস্থলীতে (upper right side)
  • সর্বাঙ্গীন দুর্বলতা বোধ
  • ঘোলাটে প্রস্রাব (dark urine)
  • ত্বক হলুদ বর্ণের হয়ে যায় যা লিভারের ক্ষতিগ্রস্ততা নির্দেশ করে

 

প্যারাসিটামল এর উপকারিতা

এর নানাবিধ উপকারিতা এটিকে অধিক পরিমাণে জনপ্রিয় করে তুলেছে। সাধারণত ওষুধ সেবনের ১ ঘন্টার মধ্যে এটির কার্যকারিতা শুরু হয়। প্রায় সব মানুষের ক্ষেত্রেই এটি নিরাপদ ভাবে ব্যবহার করা যায়। এবং NSAID গ্রুপের অন্যান্য ওষুধের (aspirin, ibuprofen, diclofenac) তুলনায় এটি বেশি নিরাপদ।

তবে প্যারাসিটামল সেবনের ফলে যথাযথ উপকারিতা দেখা না গেলে সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষত একনাগাড়ে ৩ দিন ওষুধ সেবনের পরেও জ্বর না কমলে অথবা, ৫ দিন পর্যন্ত ওষুধ খাওয়ার ফলেও যদি ব্যথার উপশম না হয় সেক্ষেত্রে ওষুধ বন্ধ করা উচিত। এছাড়াও কারো কারো ক্ষেত্রে হয়ত এলার্জিক প্রতিক্রিয়া (skin rash) দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ততক্ষণাৎ ওষুধ বন্ধ করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

প্যারাসিটামল এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (Side effects of paracetamol)

প্রায় প্রত্যেক ওষুধের কার্যকারিতার সাথে সাথে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। তুলনামূলকভাবে প্যারাসিটামল অনেকটা নিরাপদ প্রকৃতির ওষুধ যার খুবই কম সংখ্যক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। সঠিক মাত্রায় ওষুধ সেবন না করা হলে সে ক্ষেত্রে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। প্যারাসিটামল এর বেলায় যে সমস্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে তা নিম্নে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

  • বমি বমি ভাব ও বমি
  • ক্ষুধামন্দা (loss of appetite)
  • অবসন্নতা ও দুর্বলতা
  • অগ্নাশয়ের প্রদাহ (pancreatitis)
  • লিভারের ক্ষতি (Liver damage)
  • চামড়ায় ফুসকুড়ি ও
  • অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল ব্যবহারে মারাত্বক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
সে ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী।
বিশেষত যাদের প্যারাসিটামল সেবনের সাথে সাথে শরীরে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া (skin rash, allergy) দেখা দেয় তাদের বেলায় এটি ব্যবহার না করাই উত্তম।
এছাড়াও যারা দীর্ঘদিন যাবত অপুষ্টিতে (undernutrition) ভুগছে, কিডনি অথবা লিভারের রোগে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করতে হবে।

প্যারাসিটামল ট্যাবলেট এর ব্যবহার

এই ওষুধটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বড়ি বা ট্যাবলেট আকারে যা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্দেশিত করা হয়।
সাধারণত জ্বর, ঠান্ডা, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, হাঁটু ও কোমড় (back pain)
ব্যথা, দাঁতের ও কানের ব্যথা সহ মহিলাদের পিরিয়ড কালীন ব্যথা (dysmenorrhea) কমাতে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়।
ব্যবহারের সুবিধা নিশ্চিত করতে ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সাধারণত ২ টি ভিন্ন পরিমাণে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বাজারজাত করে থাকে। যথা:

১। প্যারাসিটামল ৫০০ এম জি ট্যাবলেট (Paracetamol 500 mg) যা সাধারণত মৃদু প্রকৃতির জ্বর ও ব্যথার উপসর্গে ব্যবহার করা হয়। তবে যে ক্ষেত্রে ১ গ্রাম (1000mg) পরিমাণে মাত্রা নির্ধারণ করা থাকে সেক্ষেত্রে 500mg দুইটি ট্যাবলেট একসাথে সেবন করতে হবে।

২। প্যারাসিটামল ৬৫০ এম জি ট্যাবলেট (Paracetamol 650 mg) যা সাধারণত ব্যথার ক্ষেত্রে সর্বাধিক পরিমাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটি paracetamol extend নামেও পরিচিত।

 

বয়স ও রোগের তীব্রতা অনুযায়ী ব্যবহারের সুবিধার্থে ট্যাবলেট এর পাশাপাশি
আরো কিছু আকারে (form) ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্যারাসিটামল তৈরি করে থাকে।
বাজারে যে সমস্ত ফরম্যাটে এই ওষুধ পাওয়া যায় তা নিম্নে দেওয়া হলো।

  • সিরাপ: ঘন তরল প্রকৃতির সিরাপ (syrup) আকারে পাওয়া যায় যা সাধারণত বাচ্চাদের জন্য ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে সিরাপে চিনি যুক্ত থাকতে পারে।
  • ইনজেকশন: দ্রুত জ্বর বা ব্যথা নিরাময়ের জন্য তরল আকারের (solution to infusion) ওষুধ শিরায় ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হয়। এক্ষেত্রে ওষুধ সরাসরি রক্তে মিশে দ্রুত কার্যকরী হয়। ওষুধের ডোজের পরিমাণ রোগীর বয়স ও ওজন অনুযায়ী চিকিৎসক নির্ধারণ করে থাকেন।
  • সাপোজিটরি (Paracetamol Suppository): ছোট ক্যাপসুল সদৃশ যা পায়ুপথে প্রয়োগ করা হয়।‌ সাধারণত যে ক্ষেত্রে মুখে ওষুধ সেবন করা সম্ভবপর না হয় (অচেতন রোগী) সে ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যায়। এছাড়াও তীব্র মাত্রার জ্বর দ্রুত কমাতে এটি কার্যকরী ভূমিকা রাখে।

প্যারাসিটামল সাপোজিটরি ব্যবহারের নিয়ম

প্যারাসিটামল সাপোজিটরি ব্যবহারের নিয়ম

 

জ্বর বা ব্যথা নিরাময়ের জন্য প্রায়শই প্যারাসিটামল সাপোজিটরি (suppository) ব্যবহারের প্রয়োজন হয়ে থাকে।
পায়ুপথে সাপোজিটরি প্রবেশের পর তা গলে যায় এবং এর কার্যকারিতা শুরু করে।‌
সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর জন্য সাপোজিটরি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়।

  • অত্যাধিক পরিমাণে জ্বরের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে প্যারাসিটামল সাপোজিটরি বিশেষ ভাবে কার্যকরী হয়ে থাকে
  • অচেতন রোগীর বেলায় যখন মুখে ওষুধ সেবন করা সম্ভবপর না হয়
  • শিশুদের বেলায় যখন তীব্র জ্বর থাকে অথবা মুখে ওষুধ খেতে না চায়
  • বমি হতে থাকলে যখন মুখে ওষুধ সেবনের সাথে সাথে তা বমির ফলে বেড়িয়ে আসার সম্ভাবনা থাকে

 

উপরোক্ত কারণগুলোতে ট্যাবলেট এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সাপোজিটরি ব্যবহার করা যায়।
তবে সঠিক ফলাফল পাওয়ার জন্য সাপোজিটরি ব্যবহারের কিছু নিয়ম
নির্দেশনা রয়েছে যা নিচে উল্লেখ করা হলো।

১। বাজারে দুই ধরনের সাপোজিটরি বেশি প্রচলিত।
গ্লিসারিন সাপোজিটরি যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে এবং প্যারাসিটামল সাপোজিটরি যা জ্বর ও ব্যথা কমাতে সহায়তা করে।
অবশ্যই সঠিক ধরণের (paracetamol suppository) সাপোজিটরি সংগ্রহ করতে হবে।

২। ব্যবহারের পূর্বে কিছুক্ষণ ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে যেনো এটি পায়ুপথে ভালো ভাবে প্রবেশ করানো যায়।

৩। কোলন বা রেকটাম (empty colon) খালি অবস্থায় ব্যবহারে বেশি কার্যকরী হয়ে থাকে। আর তাই ব্যবহারের পূর্বে মলাশয় খালি করার চেষ্টা (Go to the toilet first) করতে হবে।

৪। সাবান ও গরম পানি দিয়ে হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে হাতে গ্লাভস পরা যেতে পারে।

৫। আরাম দায়ক ভাবে শুয়ে, বসে অথবা এক পা চেয়ার এর উপর তুলে নিতে হবে যেনো সহজেই পায়ুপথে ঢুকানো সম্ভবপর হয়।

৫। কমপক্ষে পায়ুপথের ১ ইঞ্চি গভীরে সাপোজিটরি ঢুকাতে হবে।
অতঃপর দুই পা একসাথে চেপে ১৫ মিনিট বসে অথবা শুয়ে থাকতে হবে।

৬। কোন অবস্থাতেই সাপোজিটরি মুখে সেবন করা যাবে না।

৭। হার্টের রুগী, রেক্টাম (rectum) বা প্রোস্টেটের (prostate) এর অপারেশন হয়েছে এমন কারো ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

৮। এছাড়াও ব্যবহারের পরে যদি কোনো জটিলতা দেখা দেয় সেক্ষেত্রে সাথে সাথে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। (Ambardekar, 2019)

ক্যাফেইন কি? (What is caffeine)

ক্যাফেইন একটি জটিল জৈব যৌগ যা স্নায়ুতন্ত্রকে (central nervous system) উদ্দীপিত (stimulate) করতে পারে।
ক্যাফেইন মূলত মস্তিষ্কের উপর কাজ করে যা শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করতে সক্ষম।
তবে ক্যাফেইন অনিদ্রা ও বিষন্নতা সৃষ্টি করে।
ক্যাফেইন যৌগের নানাবিধ ব্যবহারের মধ্যে অন্যতম একটি ব্যবহার হলো চিকিৎসা ব্যবস্থায় ওষুধ হিসেবে বিশেষত প্যারাসিটামল এর সাথে সংমিশ্রণে প্যারাসিটামল ক্যাফেইন ট্যাবলেট তৈরি হয়।

 

প্যারাসিটামলের সাথে ক্যাফেইন যোগ করলে কি হয়

প্যারাসিটামলের প্রদাহ নাশক ধর্ম বৃদ্ধি করতে প্যারাসিটামলের সাথে ক্যাফেইন নামক এক প্রকার রাসায়নিক উপাদান যোগ করা হয়।
প্যারাসিটামলে ক্যাফেইন যোগ করলে সেক্ষেত্রে এটি জ্বর ও ব্যথা কমাতে আরো বেশি কার্যকরী হয়ে থাকে।
বিশেষত ক্যাফেইনের রয়েছে অধিক পরিমাণে ব্যথানাশ করার ক্ষমতা।
সাধারণত ৫০০ এমজি প্যারাসিটামল এর সাথে ৬৫ এমজি ক্যাফেইন এর সংমিশ্রণে প্যারাসিটামল ক্যাফেইন ট্যাবলেট তৈরি করা হয়।
প্যারাসিটামল ক্যাফেইন ব্যবহারের নির্দেশনা ও সতর্কতা সমূহ:

  • প্রয়োজন মাফিক ১ অথবা ২ টি ট্যাবলেট ৪ থেকে ৬ ঘন্টা অন্তর অন্তর সেব্য।
  • ১২ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের জন্য Paracetamol ক্যাফেইন ব্যবহার করা উচিত নয়।
  • দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা উচিত নয় কেননা তাতে অনিদ্রা, বিষন্নতা ও ওষুধের প্রতি নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হতে পারে।
  • ওষুধ সেবনকালীন সময়ে চা, কফি ও চকলেট বর্জন করতে হবে।
  • গর্ভকালীন সময়ে প্যারাসিটামল ক্যাফেইন ব্যবহার করা উচিত নয়। কেননা তা গর্ভপাত অথবা শিশুর ওজন হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
  • বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের জন্য Paracetamol ক্যাফেইন খেতে নিরুৎসাহিত করা হয়।
    কারণ সে ক্ষেত্রে ক্যাফেইন বাচ্চার উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।

 

কখন প্যারাসিটামল বিষে পরিনত হয়? 

প্যারাসিটামল একটি রাসায়নিক উপাদান যা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বা মাত্রা পর্যন্ত শরীরের জন্য উপকারী।
সঠিক মাত্রায় সেবনের ফলে জ্বর ও ব্যথা নিরাময়ে সহায়তা করে।
তবে যথাযথ ব্যবহার না করে বরং বেশি পরিমাণে ব্যবহার করলে সে ক্ষেত্রে ওভার ডোজের ফলে কিছু খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় যা উপরে আলোচনা করা হয়েছে।

লিভার ড্যামেজ এর অন্যতম প্রধান কারণ Paracetamol পয়জনিং।
আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথের (NIH) এর তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক সর্বোচ্চ ৭.৫ গ্রাম (7500mg; 500mg tablet×15) পরিমাণে Paracetamol গ্রহণ করা হলে তখন বিষক্রিয়া দেখা দেয়।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের আরো কম মাত্রাতেই বিষক্রিয়া শুরু হতে পারে।
অসাবধানতাবশত শিশুরা অথবা যে কেউ বিষমাত্রায় প্যারাসিটামল গ্রহণ করলে সেক্ষেত্রে জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

উল্লেখ্য প্যারাসিটামল বিষক্রিয়ায় প্রাথমিক ভাবে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
ক্ষেত্রবিশেষে সামান্য পেট ব্যথা পরিলক্ষিত হয়ে থাকে।
কিন্তু লক্ষণ প্রকাশিত না হলেও যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
প্যারাসিটামল বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর হার ২% এর কম কিন্তু বিষক্রিয়ার সাথে সাথে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করা হলে তা লিভার (Liver) কে মারাত্বক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আর এমতাবস্থায় মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেকাংশেই বেড়ে যায়।

 

বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় কি Paracetamol নিরাপদ?

গর্ভকালীন ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় একজন মা যে সমস্ত ওষুধ সেবন করেন তার প্রভাব বাচ্চার উপর পরে। এই জন্য কিছু কিছু ওষুধ রয়েছে যা এই সময়ে নিষেধ করা হয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে প্যারাসিটামল কে নিরাপদ বলে মনে করা হয়। National Health Service (NHS) of UK এর তথ্য অনুযায়ী একজন মা যিনি তার সন্তান কে বুকের দুধ খাওয়ান তিনি জ্বর ও ব্যথা নাশক হিসেবে Paracetamol ব্যবহার করতে পারেন। NSAID গ্রুপের অন্যান্য ওষুধ যেমন ibuprofen এর তুলনায় প্যারাসিটামল নিরাপদ। তবে প্যারাসিটামলক্যাফেইন সেবন করা যাবে না।

পরিশেষে বলা যায়, Paracetamol একটি প্রাথমিক স্তরের ওটিসি (OTC) মেডিসিন হলেও এটির নিরাপদ ব্যবহার ও জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই সচেতনতা জরুরী।
প্যারাসিটামলের প্রয়োগ ক্ষেত্র, ব্যবহার বিধি ও মাত্রা সম্পর্কিত অনেক গুলো প্রয়োজনীয় বিষয় রয়েছে যা জানা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আসুন, প্যারাসিটামল এর ব্যবহার যেনো নিরাপদ হয় সেই ব্যাপারে আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং অপরকে সচেতন হতে সহায়তা করি।

Last Updated on January 13, 2022

Was this article helpful?
YesNo