থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) একটি জিনঘটিত রক্তের রোগ যা বংশগত ভাবে বাবা-মা’র থেকে বাচ্চাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। NCBI এর তথ্য অনুযায়ী সারা বিশ্বে এই রোগের ২৭০ মিলিয়ন বাহক রয়েছে আর যার দ্বারা প্রতি বছর ৩-৪ লাখ অসুস্থ্য শিশু জন্ম গ্রহণ করে থাকে। সচেতনতাই হতে পারে এই রোগের একমাত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা। থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কিত অতি প্রয়োজনীয় তথ্য এবং থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসা, নিয়ন্ত্রন ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে এই আর্টিকেলে সহজভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

থ্যালাসেমিয়া কি?

থ্যালাসেমিয়া কি? What is thalassemia?

প্রথমত জানতে হবে থ্যালাসেমিয়া কি এবং কেমন ধরনের রোগ।এটি কি কোন ছোঁয়াচে রোগ যা মহামারী আকারে করোনার মত ছড়িয়ে পড়তে পারে না;এটি কোন ছোঁয়াচে রোগ নয় তবে এটি একটি প্রাণঘাতী ব্যাধি আর উপযুক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও সচেতনতা ব্যতীত এই রোগ বংশগত ভাবে ব্যাপক আকারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে থাকে।

সাধারণত এই রোগের ক্ষেত্রে শরীরের হিমোগ্লোবিন (Hemoglobin) কণার উৎপাদনে ত্রুটি হয়। হিমোগ্লোবিন হচ্ছে লোহিত রক্তকণিকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা ফুসফুস থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করার কাজ করে থাকে। আলফা ও বিটা চেইন নামক দুই রকম চেইনের সমন্বয়ে অস্থিমজ্জায় (bone marrow) হিমোগ্লোবিন তৈরি হয়।

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে এই দুইটি চেইনের যে কোন একটি অথবা উভয়েই সমস্যা/ ত্রুটি থাকে আর যার দরুন হিমোগ্লোবিনের উৎপাদন ব্যাহত হয়। ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিনের কারণে লোহিত রক্ত (RBC) কণিকাগুলো তার স্বাভাবিক আয়ুস্কালের (১২০ দিন) আগেই অস্বাভাবিক ভাবে ভেঙে যায়। আর যার ফলে শরীরে দেখা দেয় রক্তস্বল্পতা।

 

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়

কেন,‌ কিভাবে হয় তথা থ্যালাসেমিয়ার কারণ সম্পর্কে জানা থাকা দরকার কেননা তা রোগ ‌প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
পূর্বেই বলা হয়েছে, ইহা একধরনের জিনগত রোগ যা বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে থাকে। মা বাবা দুজনেই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হয় তবে সে ক্ষেত্রে তাদের সন্তান এই রোগ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে।

যদি মা বাবার যে কোন একজন রোগের বাহক হয়ে থাকে কিন্তু অপরজন ত্রুটিপূর্ণ জিনের বাহক না হয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সুস্থ্য সন্তান জন্ম গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে সন্তান সুস্থ্য হয় তথা থ্যালাসেমিয়ার রোগী না হলেও বাহক হয়ে থাকে যা পরবর্তীতে বংশ পরম্পরায় বিস্তার করার সম্ভাবনা রাখে।

থ্যালাসেমিয়া কত ধরনের হয়?

থ্যালাসেমিয়া কত ধরনের হয় তা বিভিন্ন কারণের উপর নির্ভর করে এবং সেই সাথে কোন ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া রোগীর অধিক জটিলতা হতে পারে তা রোগের প্রকরণের উপর নির্ভর করে। সাধারণত জিনগত ত্রুটির তারতম্যের উপর ভিত্তি করে এটিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে; আলফা থ্যালাসেমিয়া বিটা থ্যালাসেমিয়া।আলফা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে জিনগত মিউটেশন এর ভিত্তিতে আরো কিছু প্রকরণ রয়েছে। তদ্রূপ বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রেও হিমোগ্লোবিনের কোন অংশ আক্রান্ত তার ভিত্তিতে প্রকরণ ও জটিলতা নির্ভর করে। আলফা ও বিটা থ্যালাসেমিয়ার প্রকরণ সমূহ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

 

আলফা: জিন সংখ্যার ত্রুটির উপর ভিত্তি করে চার প্রকারের আলফা থ্যালাসেমিয়া হতে পারে । যথা:

১. একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে সেক্ষেত্রে বাহক সৃষ্টি হবে কিন্তু কোন রোগ উপসর্গ দেখা দেয় না।

২. থ্যালাসেমিয়া মাইনর (thalassemia minor) যা দুটি জিন ত্রুটিপূর্ণ জিনের কারণে হয়ে থাকে এবং এক্ষেত্রে সামান্য (mild) উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

৩. হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ (Hemoglobin H Disease) যা তিনটি জিনের ত্রুটির কারণে হয় এবং মাঝারি মানের উপসর্গ দেখা দেয়।

৪. ইহা বিরল প্রকৃতির যা সাধারণত খুব কমই দেখা যায়। এক্ষেত্রে চারটি জিন ই ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে এবং মৃত বাচ্চা প্রসব করে ।

 

বিটা: দুটি জিন দ্বারা বিটা হিমোগ্লোবিন চেইন তৈরি হয় যার একটি জিন বাবা‌ ও একটি জিন মা থেকে প্রাপ্ত হয়। বিটা থ্যালাসেমিয়ার দুটি প্রকরণ রয়েছে। যথা:

১. থ্যালাসেমিয়া মাইনর: একটি ত্রুটিপূর্ণ জিনের কারণে সংঘটিত হয় এবং এক্ষেত্রে মৃদু প্রকৃতির উপসর্গ দেখা দেয়।

২. থ্যালাসেমিয়া মেজর: দুটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে সেক্ষেত্রে সুস্থ্য বাচ্চা প্রসব করে কিন্তু জন্মের সাধারণত ২ বছর পরে জটিলতর লক্ষণাবলী প্রকাশিত হয়। আর এই অবস্থা থ্যালাসেমিয়া নামে অধিক প্রচলিত তবে এটাকে মেডিকেল টার্ম অনুযায়ী Cooley anemia বলা হয়ে থাকে।

 

থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষণ কি কি?

থ্যালাসেমিয়ার অনেক গুলো ধরণ রয়েছে যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এই রোগের লক্ষণসমূহ রোগের ধরন ও তীব্রতার উপর নির্ভর করে ভিন্নতর হয়ে থাকে। যেমন: হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ এর ক্ষেত্রে জন্ডিস ও প্লীহার বৃদ্ধি দেখা দেয়। আবার আলফা থ্যালাসেমিয়া ৪ এর বেলায় মৃত বাচ্চা প্রসব করে।

অপরদিকে বিটা থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণাবলী জন্মের পরপরই বোঝা যায় না যা পরবর্তীতে ২ বছরের মধ্যে দেখা দেয়।
সাধারণত যেই লক্ষণ টি সবচেয়ে প্রকট ভাবে দেখা দেয় সেটি হলো রক্তস্বল্পতা বা (anemia) এনিমিয়া। হেমোগ্লোবিন তথা লোহিত রক্ত কণিকা যথাযথ ভাবে উৎপন্ন (erythropoiesis) হয় না কিন্তু স্বাভাবিক আয়ুস্কালের (১২০ দিন) আগেই অস্বাভাবিক ভাবে ভেঙে যায়। যার দরুন শরীরে তীব্র রক্তস্বল্পতা দেখা দেয়। এছাড়াও আর যে সমস্ত চিহ্ন ও লক্ষণাবলী প্রকাশিত হয় তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

  • মুখমণ্ডল হলুদ বর্ণের বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া (yellow, pale face)
  • চোখ হলুদ বর্ণের হয়ে যায়
  • ত্বক হলদে হয়ে যায় (Jaundice)
  • খাওয়াতে অরুচি দেখা দেয় (aversion to food)
  • অস্বাভাবিক অস্থি বিশেষত মুখের হাড়ের বিকৃতি দেখা যায়
  • শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি/বেড়ে উঠা ব্যহত হয়
  • শরীরে অবসন্নতা, ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব হয়
  • ঘোলাটে প্রস্রাব (dark urine) এবং প্রস্রাবে তলানি দেখা দিতে পারে
  • প্লীহার বৃদ্ধি (splenomegaly) যার দরুন পেট ফোলা পরিলক্ষিত হয়

 

থ্যালাসেমিয়া টেস্ট করবার উপযুক্ত সময় কখন?

প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিবেচনায় থ্যালাসেমিয়া টেস্ট বা রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো বিবাহের পূর্বেই ছেলে ও মেয়ে উভয়েরই থ্যালাসেমিয়া টেস্ট করে নিশ্চিত হওয়া,
যে কেউ আক্রান্ত অথবা দুজনেই বাহক কিনা। যদি দুজনেই বাহক হয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সন্তান আক্রান্ত হবে।

তবে ছেলে ও মেয়ের যে কোন একজন রোগের বাহক কিন্তু অপরজন বাহক না হয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সুস্থ্য সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে। যদিও এক্ষেত্রে সন্তান এই রোগের বাহক হয়ে থাকে কিন্তু তাতে কোন অসুবিধা হবে না। অন্যথায়,যদি বিয়ের পূর্বে টেস্ট না করা হয়ে থাকে তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সন্তান নেওয়ার আগেই থ্যালাসেমিয়া টেস্ট করে নিতে হবে।

রোগ প্রতিকারের বেলায় অর্থাৎ যদি অসুস্থ শিশু জন্ম গ্রহণ করে তবে সে ক্ষেত্রে জন্মের ২ বছরের মধ্যে নানাবিধ লক্ষণাবলী (উপরে বর্ণিত) প্রকাশিত হয়। তখন চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
অতঃপর ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা (Diagnosis) পূর্বক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা করতে হবে।

কীভাবে থ্যালাসেমিয়ার ডায়াগনিসিস করা হয়?

কীভাবে থ্যালাসেমিয়ার ডায়াগনিসিস করা হয়

সাধারণত স্যাম্পল হিসেবে রক্ত নিয়ে ল্যাবে নানাবিধ পরিক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করা হয়ে থাকে। যে সমস্ত টেস্ট গুলো সাধারণত করা হয়ে থাকে তা নিম্নরূপ:

  • CBC (complete blood count)
  • Hemoglobin electrophoresis
  • High performance liquid chromatography
  • DNA testing

CBC পরীক্ষার মাধ্যমে লোহিত রক্ত কণিকার অস্বাভাবিক আকার পরিলক্ষিত হয় এবং Hemoglobinn electrophoresis এর মাধ্যমে কোন ধরনের থ্যালাসেমিয়া তা নির্ধারণ করা সম্ভবপর হয়ে থাকে। গর্ভবতী অবস্থায় পরীক্ষার মাধ্যমে যদি জানা যায় যে অনাগত সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে তবে সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা (abortion) গ্রহণ করা যেতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা কি?

পরিক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগ সনাক্ত হলে সে ক্ষেত্রে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ থাকা যায়। সাধারণত মৃদু প্রকৃতির তথা আলফা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোন চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে Hemoglobin H disease (আলফা থ্যালাসেমিয়া -৩) এর ক্ষেত্রে ক্ষেত্রবিশেষে রক্ত সরবরাহ করা লাগতে পারে। অপরদিকে বিটা থ্যালাসেমিয়া বিশেষত থ্যালাসেমিয়া মেজর এর (thalassemia major) ক্ষেত্রে চিকিৎসা নেওয়া বাধ্যতামূলক। রোগের তীব্রতা অনুযায়ী কতিপয় কার্যকরী চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে যা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

. রক্ত দেওয়া: শিরায় রক্ত সরবরাহ করা (blood transfusion) এই রোগের একটি সহজ ও কার্যকরী চিকিৎসা ব্যবস্থা। সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ অন্তর অন্তর রক্ত দেওয়ার মাধ্যমে শরীরে লোহিত রক্ত কণিকা ও হিমোগ্লোবিনের ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ রাখা সম্ভবপর হয়। তবে রোগের তীব্রতা কম হলে সে ক্ষেত্রে রক্ত দেওয়ার সময়ের তারতম্য হতে পারে (সর্বোচ্চ ৪ মাস অন্তর) ।

. আয়রন চিলেশন: দীর্ঘদিন ধরে রক্ত দেওয়ার ফলে রক্তে আয়রনের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। অত্যাধিক পরিমাণে আয়রন (Iron) জমা হওয়ার ফলে আয়রন বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে যা রোগীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। আয়রন চিলেশন (iron chelation therapy) এমন একধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা যার মাধ্যমে শরীরে জমা অতিরিক্ত আয়রন নিষ্কাশন করা সম্ভবপর হয়। তাই রক্ত সরবরাহ বা ব্লাড ট্রান্সফিউশন এর পাশাপাশি আয়রন চিলেশন ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে আয়রন চিলেশন একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি।

. Splenectomy: বার বার রক্ত সঞ্চালনের ফলে প্লীহা (spleen) বড় হয়ে যেতে পারে যাকে বলা হয় splenomegaly. এক্ষেত্রে শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে প্লীহা অপসারণ করা হয়ে থাকে যা মেডিকেলের ভাষায় Splenectomy নামে পরিচিত।

. Nutritional supplements: ফলিক এসিড সাপ্লিমেন্ট ও ভিটামিন বি১২ কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এই পুষ্টি উপাদান দুটি রক্ত কণিকা উৎপাদনে সহায়তা করে থাকে। তবে রোগীকে অবশ্যই আয়রন সমৃদ্ধ খাবার ও আয়রন ট্যাবলেট গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সেই সাথে ধুমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস পরিত্যাগ করা জরুরী। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত মৃদু প্রকৃতির শরীর চর্চার (exercise) মাধ্যমে সুস্থ থাকা যায়।

. Bone marrow transplant: এটি বিপুল ব্যয়বহুল কিন্তু কার্যকরী একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি আর এই অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমেই থ্যালাসেমিয়ার সর্বোচ্চ প্রতিকার করা সম্ভবপর হয়েছে। এক্ষেত্রে একজন সুস্থ ব্যক্তি (Doner) প্রয়োজন যার সাথে রোগীর HLA নামক এক বিশেষ ধরনের প্রোটিন কণার মিল রয়েছে। শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে bone marrow stem cell transplant সম্পন্ন করা হয়ে থাকে এবং পরবর্তী ১ মাসের মধ্যে রোগীর শরীরে সুস্থ রক্ত কণিকা উৎপাদন শুরু হয়ে থাকে।

থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার তালিকা

থ্যালাসেমিয়া রোগীর খাবার তালিকা Diet list of thalassemia patients

থ্যালাসেমিয়া একটি জটিলতর রোগ আর তাই সুস্থ জীবন যাপনের জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। রোগীকে অবশ্যই আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে কেননা থ্যালাসেমিয়া রোগীর শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে আয়রন জমা হয়।

উপরন্তু আয়রন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। আয়রন বেশি রয়েছে এমন খাবার যেমন ডিমের কুসুম, লাল মাংস, কলিজা, সামুদ্রিক মাছ, ছোলা, ডাল, শিম ও মটরশুটি, ফুলকপি, পালংশাক, ডার্ক চকলেট (Dark chocolate) ইত্যাদি অবশ্যই পরিত্যাজ্য। অপরদিকে, এমন কিছু খাবার রয়েছে যাতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি ১২ ও ফলিক এসিড রয়েছে যা রক্ত উৎপাদনে সহায়তা করে।

এসব খাবার যেমন ব্রকলি, কমলা লেবু, সবুজ শাকসবজি ও বাদাম জাতীয় খাবার বেশি পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে। তবে এমন অনেক খাবার, যেমন কলিজা, ডিমের কুসুম যেগুলোতে ফলিক এসিড ও ভিটা-B12 রয়েছে।
আবার অধিক পরিমাণে আয়রন ও রয়েছে এমন খাবার পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, খাবার থ্যালাসেমিয়া কে রোধ করতে পারে না তবে সুস্থ জীবন যাপন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

থ্যালাসেমিয়ার জটিলতা কি?

থ্যালাসেমিয়া একটি জটিলতর বংশগত ব্যাধি যার সহজ ও কার্যকরী প্রতিকার করা দুরূহ ব্যাপার। বয়স বাড়ার সাথে সাথে রোগের জটিলতা বাড়তে থাকে যা পরবর্তীতে একসময় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। রোগ নির্ণয়ের সাথে সাথে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করলে সুস্থ জীবন যাপন সম্ভবপর হয়ে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে (bone marrow transplant চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে) এই রোগের হাত থেকে পুরোপুরি নিস্তার পাওয়া যেতে পারে। অন্যথায় যেসব জটিলতা হতে পারে তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

১. অস্থির (bone) বিকৃতি ঘটতে পারে বিশেষত মুখমণ্ডল ও মাথার খুলির (skull).

২. শিশুর বৃদ্ধি ব্যহত হয়ে থাকে। হার্টে সমস্যা দেখা দেয় বিশেষত হার্ট ফেইলুর (heart failure) ও অনিয়মিত হৃদয় স্পন্দন (abnormal heart rhythms) হয়।

৩. প্লীহা (spleen) অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায় যা একসময় শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে অপসারণ করা জরুরী হয়ে পড়ে।

৪. বার বার রক্ত সঞ্চালনের ফলে রোগীর শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমা হতে থাকে যা পরবর্তীতে আয়রন বিষক্রিয়া ঘটায়।

৫. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় আর যার দরুন খুব সহজেই শরীরে ইনফেকশন হতে পারে।

 

শিশুদের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া

সাধারণত জন্মগতভাবে একটি শিশু থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়ে থাকে যা, শিশু ও মা বাবার কোন ভুল থেকে নয় বরং জেনেটিক্যালি বা জিনগত কারণে সংঘটিত হয়। শিশুর বয়স বৃদ্ধির ২ বছরের মধ্যে রোগ লক্ষণ প্রকাশিত হতে শুরু করে যা পরবর্তীতে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া তথা পরিক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগের নিরুপন করা হয়। থ্যালাসেমিয়া মেজর বা Cooley anemia তে আক্রান্ত সন্তান বড় হয়ে সাধারণত ৩০ বৎসর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

শিশুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা দেখা দেয় সেটি হলো তার যথাযথ বৃদ্ধি না হওয়া। আর সেই সাথে রক্তস্বল্পতা, অরুচি, দুর্বলতা সহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। শিশুটি স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠতে পারে না। শিশু মনে হীনমন্যতার সৃষ্টি হয় ও নিজেকে অস্বাভাবিক ভাবে এবং সেই সাথে সবার সঙ্গ এড়িয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখে।যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ,
নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন,ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে এ রোগে আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ জীবন যাপনের ব্যবস্থা করে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব।

 

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য কি ধরণের মেডিক্যাল পরিচর্চার প্রয়োজন?

থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য কি ধরণের মেডিক্যাল পরিচর্চার প্রয়োজন?

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর সঠিক পরিচর্যা, যথাযথ চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা প্রদান শিশুর স্বাভাবিক জীবন যাপন ও সঠিক ভাবে বেড়ে উঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর তাই এই বিষয়ে কাজ করছে অনেক আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংগঠন যেমন Cooley’s Anemia Foundation উল্লেখযোগ্য। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে শিশুর যে সমস্ত পরিচর্যা ও সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন তা নিম্নে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

  • নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন ও যথোপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করা
  • পুষ্টিকর খাবার প্রদান করা
  • পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে শেখানো
  • ইনফেকশন প্রতিরোধে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো
  • দীর্ঘ ভ্রমণে অবশ্যই ঘন ঘন পানি পানের ব্যবস্থা রাখা
  • কায়িক পরিশ্রম ও মৃদু প্রকৃতির ব্যায়াম করতে উৎসাহিত করা
  • মানসিক সহায়তা ও সব শিশুদের সাথে স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ করে দেওয়া
  • অন্যান্য অসুস্থ (বিশেষত সংক্রামক ব্যাধি গ্রস্থ) লোকদের সংস্পর্শ থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা
  • শিশুর সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার বজায় রাখা
  • একা একা হীনমন্যতায় ভোগে এমন পরিস্থিতিতে না রাখা
  • অস্বাভাবিক ও অভিশপ্ত শিশু হিসেবে আচরণ না করা ইত্যাদি।

 

থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে ব্লাড ট্রান্সফিউশন এর জন্য সতর্কীকরণ

থ্যালাসেমিয়া রোগীর শরীরে লোহিত রক্ত কণিকা (RBC) ও‌ হিমোগ্লোবিন এর ঘাটতি হয়। আর তাই এই ঘাটতি পূরণে নিয়মিত অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে রক্ত শিরার‌ মাধ্যমে দেওয়া হয়ে থাকে। তবে রক্ত সঞ্চালনের এই প্রক্রিয়ায় অবশ্যই কিছু নিয়ম যথাযথ ভাবে মেনে চলতে হবে। অন্যথায় রক্ত সঞ্চালনের ফলে নানাবিধ অসুবিধা যেমন ইনফেকশন, এলার্জি, জ্বর, কাঁপুনি সহ নানাবিধ জটিলতর সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তাই রক্ত সঞ্চালনের জন্য কতিপয় সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। যেমন:

  • প্রথমত রক্তের গ্রুপ মেলাতে হবে। কোন অবস্থাতেই অজানা গ্রুপের রক্ত সঞ্চালন করা যাবে না। উপরন্তু ক্রসমেচিং (Cross-matching) করে নিতে হবে।
  • রক্তের গ্রুপে মিল খুঁজে না পাওয়া গেলে O নেগেটিভ রক্ত দেওয়া যেতে পারে। কেননা O হচ্ছে সার্বজনীন রক্তদাতা গ্রুপ।
  • অসুস্থ ও ইনফেকশন যেমন Hepatitis B & C, HIV আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত গ্রহণ করা যাবে না।
  • রক্ত অবশ্যই শিরায় (vein) সঞ্চালন করতে হবে।
  • কোন অসুবিধা বা খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ করতে হবে।

 

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করণীয়

থ্যালাসেমিয়ার যথাযথ প্রতিকার পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর, জটিল ও ব্যয়বহুল। প্রতিরোধ ই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ, উপযুক্ত ও‌ কার্যকরী উপায়। আর একমাত্র সচেতনতা ও সঠিক পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমেই এই রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।
এই রোগ প্রতিরোধে বিবাহের পূর্বেই অবশ্যই ছেলে ও মেয়ে দুজনেরই থ্যালাসেমিয়া টেস্ট বাধ্যতামূলক‌ ভাবে করা উচিত।

দুইজন বাহক এর মধ্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া তথা নতুন সন্তান জন্ম না দেওয়ার‌ মাধ্যমে এই রোগ নির্মুল করা সম্ভব।
উল্লেখ্য চিকিৎসার মাধ্যমে একজন বাহক তার থ্যালাসেমিয়া বহনকারী জিন প্রতিহত করতে সক্ষম হবেন না।
তবে এক্ষেত্রে একজন বাহক শুধুমাত্র সচেতন হয়ে অন্য আরেক জন বাহককে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবেন।

আন্তর্জাতিক ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সারা বিশ্বে প্রতিবছর ৮ মে বিশ্ব এই রোগের দিবস পালিত হয়ে থাকে।আসুন আমরা সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন ও প্রতিরোধ  সম্পর্কে নিজে জানি ও অন্যকে জানতে সহায়তা করি।

Last Updated on March 19, 2022

Was this article helpful?
YesNo