চর্বি বা ফ্যাট খাদ্যের অপরিহার্য একটি উপাদান যা শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে চর্বির অনেকগুলো প্রকরণ রয়েছে যার মধ্যে কোনটি স্বাস্থ্যসম্মত আবার কোনটিতে রয়েছে নানাবিধ স্বাস্থ্য ঝুঁকি যেমন ওজন বৃদ্ধি হওয়া, হৃদরোগ, কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া, স্ট্রোক ইত্যাদি।

কোন ধরনের চর্বি কতটুকু পরিমাণে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে এবং তা কোন কোন খাবার থেকে পাওয়া যায় সেই বিষয়ে এই অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে। সেই সাথে পুরুষদের স্বাস্থ্য ও ফিটনেসের জন্য শরীরের চর্বি পরিসীমা কি এবং পেটের চর্বি কমানোর কার্যকরী উপায় সমূহ সম্বন্ধে এই অনুচ্ছেদের শেষের দিকে আলোকপাত করা হয়েছে।

মানুষের শরীরে ফ্যাট এর কাজ কি?

খাদ্যের সাতটি উপাদান হলো শর্করা, আমিষ, চর্বি (Fat), খনিজ, ভিটামিন, ফাইবার ও পানি। প্রত্যেকটি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যার একটির চাহিদা অন্যটি দিয়ে পূরণ করা সম্ভবপর নয়। তেমনি ভাবে এককভাবে কোনো খাবার নেই যার মধ্যে প্রয়োজনীয় এই সবগুলো উপাদান রয়েছে। চর্বি বা ফ্যাট জাতীয় খাবার শরীরের যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলীতে বিশেষ ভূমিকা রাখে তা হলো:

  • চর্বিতে দ্রবনীয় ভিটামিন সমূহ যেমন ভিটামিন এ, ডি, ই, কে ইত্যাদি শোষণের জন্য ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবারের প্রয়োজন হয়ে থাকে
  • ফ্যাট থেকে অনেক বেশি পরিমাণে শক্তি (ক্যালরি) পাওয়া যায় যা শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখতে এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যয় হয়ে থাকে
  • শরীরের প্রত্যেকটি কোষের আবরণ (Cell membrane) রয়েছে। আর ফ্যাট প্রত্যেক টি কোষের আবরণ ঠিক রাখতে সহায়তা করে
  • ফ্যাট শরীরে হরমোন উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে

স্বাস্থ্যকর চর্বি কি? (What is healthy fat in Bangla?)

স্বাস্থ্যকর চর্বি কি

ফ্যাটের অনেক গুলো প্রকরণ রয়েছে যার মধ্যে প্রধান তিনটি প্রকরণ হলো স্যাচুরেটেড ফ্যাট, আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, ও ট্র্যান্স ফ্যাট। (Hoque, 2019) প্রচলিত মত অনুযায়ী মানুষ মনে করে থাকেন যে ফ্যাট মানেই ক্ষতিকর এবং ফ্যাট শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে থাকে। বস্তুত ফ্যাট শরীরের জন্য উপকারী উপাদান যাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি তথা শক্তি। তবে সবধরনের ফ্যাট স্বাস্থ্যের জন্য সমান উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে না। বরং ট্র্যান্স ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট ‌শরীরের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

স্বাস্থ্যকর চর্বির মধ্যে রয়েছে শুধুমাত্র আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (Unsaturated fat) যা প্রধানত উদ্ভিজ্জ উৎস ও মাছ থেকে পাওয়া যায়। আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি কক্ষ তাপমাত্রায় (২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তরল আকারে থাকে। এই ধরনের ফ্যাটের আবার দুইটি প্রকরণ রয়েছে। যেমন:

১। মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট: মনো শব্দের অর্থ হলো এক অর্থাৎ এই ধরনের আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের হাইড্রোকার্বনের মধ্যে একটি মাত্র দ্বি বন্ধন (Double bond) রয়েছে।

২। পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট: পলি শব্দ দ্বারা বহু বোঝানো হয়ে থাকে অর্থাৎ এই ধরনের আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের হাইড্রোকার্বনের মধ্যে দুই বা তার বেশি সংখ্যক দ্বি বন্ধন (Double bond) রয়েছে।

হাইড্রোকার্বন বন্ধনের (Hydrocarbon Bond) এই বিষয়টি রসায়নের বিষয়বস্তু যা দুই ধরনের ফ্যাটের মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপরোক্ত দুই ধরনের ফ্যাট ই শরীরের জন্য স্বাস্থ্যকর। মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট শরীরের জন্য যে সমস্ত উপকারী ভূমিকা পালন করে তা হলো:

  • রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL for low-density lipoprotein) এর পরিমাণ কমাতে এবং ভালো কোলেস্টেরল (HDL for high-density lipoprotein) এর পরিমাণ বাড়াতে সহায়তা করে
  • হৃদরোগ যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়
  • বাত ব্যথা, প্রদাহ (Inflammation) ও অ্যালার্জি প্রতিরোধে সহায়তা করে
  • এছাড়াও মানসিক রোগ যেমন বিষন্নতা ও ডিমেনশিয়ার (ভুলে যাওয়া রোগ) ঝুঁকি কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখে

স্যাচুরেটেড ফ্যাট কি? (What is saturated fat?)

স্যাচুরেটেড ফ্যাটকে বাংলায় বলা হয় সম্পৃক্ত চর্বি যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই ধরনের ফ্যাটের হাইড্রোকার্বন বন্ধনের মধ্যে কোন দ্বি বন্ধন (Double bond) নেই। এই ফ্যাটের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ইহা কক্ষ তাপমাত্রায় কঠিন (Solid) আকারে থাকে। স্যাচুরেটেড ফ্যাটের অনেক গুলো প্রকরণ রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হলো স্টিয়ারিক এসিড, লরিক এসিড, পালমিটিক এসিড, মাইরিস্টিক এসিড ও ক্যাপরিক এসিড। (Hoque, 2019)

স্যাচুরেটেড ফ্যাটের প্রধান উৎস হলো প্রাণীজ খাবার অর্থাৎ গরুর মাংস, মুরগির মাংস ও চামড়া, ডিম, দুধ, মাখন, ঘি ইত্যাদি। এছাড়াও পাম অয়েল এবং নারিকেল তেলের মধ্যেও স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে।

সাধারণত স্যাচুরেটেড ফ্যাটকে শরীরের জন্য ক্ষতিকর মনে করা হয়ে থাকে। কারণ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা বাড়ায় যা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। এছাড়াও স্যাচুরেটেড ফ্যাট স্থূলতা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মধ্যে পার্থক্য কি?

আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে যা এখানে ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো। দুই ধরনের ফ্যাটের মধ্যকার তুলনা করে এই অংশটুকু সাজানো হয়েছে যা খুব সহজেই আপনাকে এই দুই ধরনের ফ্যাটের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করবে।

স্যাচুরেটেড ফ্যাট (Saturated fat) আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (Unsaturated fat)
কোন দ্বি বন্ধন নেই এক বা একাধিক দ্বি বন্ধন রয়েছে
কক্ষ তাপমাত্রায় কঠিন প্রকৃতির কক্ষ তাপমাত্রায় তরল প্রকৃতির
অনেকগুলো প্রকরণ রয়েছে দুইটি মাত্র প্রকরণ রয়েছে
প্রধানত প্রাণিজ উৎস থেকে পাওয়া যায় প্রধানত উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে পাওয়া যায়
স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী

Good fat এবং bad fat

স্বাস্থ্যের উপর ফ্যাটের প্রভাব বিবেচনায় সবধরনের ফ্যাটকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেমন:

Good fat: শুধুমাত্র আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রুপের দুইটি প্রকরণ অর্থাৎ মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ও পলি আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট ভালো ফ্যাট বলে বিবেচিত।

Bad fat: সকল প্রকারের স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্র্যান্স ফ্যাটকে খারাপ প্রকৃতির ফ্যাট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ট্র্যান্স ফ্যাট কি?

চলুন এবারে ট্র্যান্স ফ্যাট সম্পর্কে জানা যাক। সবচেয়ে খারাপ ও ক্ষতিকর প্রকৃতির ফ্যাট হলো ট্র্যান্স ফ্যাট (Trans fat) যার দুইটি মাত্র প্রকরণ রয়েছে। একটি হলো প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত ফ্যাট যা তুলনামূলক কম ক্ষতিকর এবং অন্যটি হলো কৃত্রিম ভাবে তৈরিকৃত যা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিকর। ট্র্যান্স ফ্যাটের উৎস হলো মাখন, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফাস্ট ফুড, কেক, পেস্ট্রি ইত্যাদি। স্যাচুরেটেড ফ্যাটের মতই ট্র্যান্স ফ্যাট রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) এর পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং সেই সাথে ভালো কোলেস্টেরলের (HDL) মাত্রা কমিয়ে দেয়। উল্লেখ্য প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় উপাদান তালিকা দেখে নিতে হবে যে তাতে ট্র্যান্স ফ্যাট রয়েছে কিনা। ট্র্যান্স ফ্যাটের কোনো সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা নেই আর তাই শূন্য মাত্রায় (no trans fats) ট্র্যান্স ফ্যাট রয়েছে এমন খাবার কেনা উচিত। (Madell, 2020) 

ফ্যাট /চর্বি জাতীয় খাবারের উৎস কি কি?

চর্বি জাতীয় খাবারের উৎস কি কি

What is the source of fatty foods

প্রাত্যহিক জীবনে আমরা যে সমস্ত খাবার গ্রহণ করে থাকি তার মধ্যে থেকে শরীর প্রয়োজনীয় উপাদান গুলো শোষণ করে নেয়। আর অবশিষ্ট ও অপ্রয়োজনীয় উপাদান গুলো মল/বর্জ্য হিসেবে শরীর থেকে বেড়িয়ে যায়। চর্বি জাতীয় খাবার গুলো খাওয়ার পর তা পাকস্থলী ও অন্ত্রের (Small intestines) মধ্যে গিয়ে হজম ও শোষণ হতে থাকে। ফ্যাট বা চর্বি নামক এই উপাদানটি কোন কোন খাবার থেকে পাওয়া যায়? অর্থাৎ ফ্যাট/চর্বি জাতীয় খাবার কি কি? এই অংশে আমরা ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় সবগুলো খাবার তুলে ধরার চেষ্টা করব।

কাজুবাদাম, চিনা বাদাম, অ্যাভোকাডো, জলপাই তেল, চিনা বাদাম তেল, সূর্যমুখী তেল, তিলের তেল, সরিষার তেল, সয়াবিন তেল সহ প্রায় সব ধরনের উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে কম বেশি ফ্যাট পাওয়া যায়। এছাড়াও সামুদ্রিক মাছ এবং মাছের তেল থেকেও ফ্যাট পাওয়া যায়। এই সমস্ত ফ্যাট গুলো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের অন্তর্ভুক্ত যা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত।

গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস, হাস মুরগির মাংস ও চামড়া, ডিম, দুধ, মাখন, পনির, ঘি ইত্যাদি হলো স্যাচুরেটেড ফ্যাটের প্রধান উৎস।
এই সমস্ত খাবার গুলো প্রাত্যহিক খাবার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া খুবই কঠিন বিষয়।
তবে ক্ষতির দিক বিবেচনায় নানাবিধ গবেষণার পর এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ এই খাবার গুলো কম পরিমাণে (very sparingly) খাওয়া যেতে পারে।

মাখন, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফাস্ট ফুড, কেক, পেস্ট্রি ইত্যাদি খাবার গুলোতে রয়েছে ট্র্যান্স ফ্যাট যা একদমই বর্জন করা উচিত। (Madell, 2020)

কি পরিমানে চর্বি বা “ফ্যাট” খাওয়া উচিত?

আদর্শ খাদ্য (Balance diet) তালিকা অনুযায়ী দৈনিক ক্যালরি চাহিদার ৩০ শতাংশ ফ্যাট বা চর্বি থেকে গ্রহণ করা উচিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষের দৈনিক প্রায় ৩০০০ ক্যালরির (3000 kcal) প্রয়োজন পড়ে। তবে পরিশ্রমের উপর ভিত্তি করে ক্যালরির চাহিদা কম বেশি হতে পারে। অর্থাৎ কম পরিশ্রমী মানুষের (যেমন: ছাত্র) জন্য ২৫০০ ক্যালরি এবং কঠোর পরিশ্রমী মানুষদের জন্য সর্বোচ্চ ৪০০০ ক্যালরি প্রয়োজন হতে পারে।

অপরদিকে একজন নারীর ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম ক্যালরির প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জন্য দৈনিক প্রয়োজন ২৪০০ ক্যালরি এবং পরিশ্রম ভেদে তা সর্বনিম্ন ২০০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০০ পর্যন্ত প্রয়োজন হয়ে থাকে। তবে একজন গর্ভবতী নারী এবং শিশুকে বুকের দুধ পান করান এমন মায়ের জন্য অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৫০০ ক্যালরির প্রয়োজন পড়ে। (Hoque, 2019)  

১ গ্রাম চর্বিতে রয়েছে ৯ ক্যালরি শক্তি। দৈনিক ক্যালরি চাহিদার ৩০ শতাংশ হিসেবে ৩০০০ ক্যালরি চাহিদার একজন মানুষের দৈনিক সর্বোচ্চ ৯০০ ক্যালরি পর্যন্ত চর্বি জাতীয় খাবার থেকে গ্রহণ করা উচিত। আর ১ গ্রাম চর্বিতে ৯ ক্যালরি হিসেবে ১০০ গ্রাম ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা যেতে পারে। তেমনি ভাবে কম পরিশ্রমী মানুষ যাদের ক্ষেত্রে মাত্র ২৫০০ ক্যালরি দরকার তাদের জন্য ৭৫ গ্রাম ফ্যাট গ্রহণ করা উচিত। এই সূত্র অনুযায়ী হিসেব করে ফ্যাট জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। তবে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য ডায়েট কন্ট্রোলকারী ব্যক্তিদের জন্য এই সূত্রের ব্যতিক্রম হতে পারে। সেক্ষেত্রে একজন পুষ্টিবিদ (Dietitian) এর নির্দেশনা অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করতে হবে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খাবার থেকে হজম ও বিপাক (Metabolism) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যালরিতে রুপান্তরিত হতে শরীরের মধ্যে থাকা কিছু ক্যালরি ব্যয় হয়ে থাকে। হিসেব করে দেখা গেছে যে একটি খাবার থেকে যে পরিমাণ ক্যালরি পাওয়া যায় তার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যালরি ব্যয় হয় হজম ও বিপাক প্রক্রিয়ায়।

আর তাই খাবার থেকে যে পরিমাণ ক্যালরি পাওয়া যায় তা থেকে হজম ও বিপাকে ব্যয় হওয়া ক্যালরি বাদ দিয়ে খাবারের প্রকৃত ক্যালরি হিসেব করা হয়। আর এই জন্যই দৈনিক ক্যালরি চাহিদার চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি পর্যন্ত খাবার গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। অর্থাৎ ১০০ গ্রামের পরিবর্তে ১১০ গ্রাম ফ্যাট জাতীয় খাবার গ্রহণ করা উচিত। (Hoque, 2018)

কি কি হেলথি ফ্যাট আছে?

দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্ত খাবার ফ্যাটের উৎস হিসেবে খাওয়া হয় তার সবটা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কিছু কিছু ফ্যাট খাবার হিসেবে অনেক সুস্বাদু কিন্তু ততটা স্বাস্থ্যসম্মত (Healthy) নয়। তবে এই অংশে আমরা এমন কিছু ফ্যাট জাতীয় খাবার নিয়ে আলোচনা করবো যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী ভূমিকা পালন করে। সেই সাথে কোন খাবারের মধ্যে কতটুকু পরিমাণে ফ্যাট ও ক্যালরি রয়েছে সেই সম্পর্কে জানা যাবে। (Leonard, 2018)

অ্যাভোকাডো:

পুষ্টিগুণে ভরপুর প্রাকৃতিক এই খাবারটিতে প্রচুর পরিমাণে স্বাস্থ্যসম্মত আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে।
প্রতি ২০০ গ্রাম অ্যাভোকাডোতে প্রায় ২৯ গ্রাম ফ্যাট রয়েছে যা থেকে ৩২২ ক্যালরি পাওয়া সম্ভব।
এছাড়াও অ্যাভোকাডোতে বিশেষ একধরনের ফ্যাট (Oleic acid) রয়েছে।
আর গবেষণায় দেখা গেছে যে বিশেষ ধরনের এই ফ্যাটে রয়েছে ক্যান্সার প্রতিরোধ করার সক্ষমতা।
এছাড়াও তা হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়।‌ সাধারণত ফল বা সালাদ হিসেবে অ্যাভোকাডো খাওয়া যায়।

চিয়া বীজ:

চিয়া বীজ ‌হলো একমাত্র উদ্ভিজ্জ উৎস যা থেকে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়। প্রতি এক‌ আউন্স (২৮.৩৫ গ্রাম) পরিমাণ চিয়া বীজে রয়েছে ৮.৭০ গ্রাম ফ্যাট। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথ (NIH of US) এর তথ্য অনুযায়ী চিয়া বীজ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। (Leonard, 2018) এছাড়াও বাত ব্যথা কমাতে ও‌ প্রদাহ নাশক হিসেবে এর কার্যকারিতা রয়েছে।

ডার্ক চকোলেট:

এক আউন্স (২৮. ৩৫ গ্রাম) ডার্ক চকোলেট ৯ গ্রাম ফ্যাট সরবরাহ করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত ডার্ক চকোলেট খাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি কম রয়েছে। (Leonard, 2018)

মাছ:

প্রাণিজ উৎস হিসেবে মাছ একটি নিরাপদ খাবার।‌ মাছে রয়েছে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। বিশেষত তা হৃদপিন্ড ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ভালো রাখতে সহায়তা করে। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশন (AHA) এর নির্দেশনা অনুযায়ী নিয়মিত মাছ খাওয়া উচিত অন্তত প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ২ দিন। (Leonard, 2018)

ডিম:

যদিও ডিম কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করা হতো কারণ ডিমের মধ্যে রয়েছে স্যাচুরেটেড ফ্যাট।
কিন্তু কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে দৈনিক ১ টি করে ডিম খাওয়া নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত হতে পারে।
তবে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডিম খাওয়া উচিত।

তিসি:

গ্রামীণ এই খাবার ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডের একটি অন্যতম উৎস। তিসি সরাসরি পিষে খাবার হিসেবে খাওয়া যায় অথবা তিসি থেকে তেল পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে এই খাবারে রয়েছে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর বিশেষ সক্ষমতা। (Leonard, 2018)

বাদাম:

বাদামে রয়েছে নানাবিধ ভিটামিন, খনিজ, আমিষ, ফাইবার ও ফ্যাট। এক আউন্স কাঠবাদামে রয়েছে ১৪ গ্রাম ফ্যাট যা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ নিউট্রিশান এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা নিয়মিত বাদাম খায় তাদের ক্ষেত্রে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা কম রয়েছে। (Leonard, 2018)

জলপাই তেল:

এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলে রয়েছে মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট যা হার্টের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এছাড়াও এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে এন্টি অক্সিডেন্ট, ভিটামিন-ই এবং ভিটামিন-কে।

এছাড়াও রান্নার কাজে ভোজ্যতেল হিসেবে বিশুদ্ধ সয়াবিন তেল (স্যাচুরেটেড ও ট্র্যান্স ফ্যাট মুক্ত),‌ সরিষার তেল অথবা রাইস ব্রান তেলের (Rice bran oil) ব্যবহার নিরাপদ বলে বিবেচিত। তবে তেলের ব্যবহার অবশ্যই পরিমিত মাত্রায় হওয়া উচিত।

পুরুষদের স্বাস্থ্য এবং ফিটনেসের জন্য সর্বোত্তম শরীরের চর্বি পরিসীমা কি?

সাধারণত মহিলাদের শরীরের তুলনায় পুরুষদের শরীরে কম পরিমাণে ফ্যাট বা চর্বি রয়েছে। আমেরিকান কাউন্সেল অন এক্সারসাইজ (ACE) এর দেওয়া নির্দেশিকা অনুযায়ী একজন পুরুষ মানুষের শরীরের সর্বনিম্ন ২-৫ শতাংশ ফ্যাট থাকা জরুরি। আবার চর্বির পরিমাণ ২৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে তা অতিরিক্ত বা স্থূলতা স্বাস্থ্য হিসেবে পরিগণিত হবে। পুরুষদের স্বাস্থ্য এবং ফিটনেসের জন্য সর্বোত্তম শরীরের চর্বি পরিসীমা হলো ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ। এই পর্যায়ে ACE এর দেওয়া চার্ট টি নিচে তুলে ধরা হলো। (Lindberg, 2019)

ক্যাটাগরি চর্বির পরিমাণ
প্রয়োজনীয় মাত্রা (সাধারণত) ২-৫ শতাংশ
অ্যাথলেটস ৬-১৩ শতাংশ
সর্বোত্তম ফিটনেস ১৪-১৭ শতাংশ
গ্রহণযোগ্য ১৮-২৪ শতাংশ
স্থূলতা ২৫ শতাংশের বেশি

 

এছাড়াও পরুষের বয়স ভেদে শরীরের চর্বি পরিসীমার মাত্রা কম বেশি হয়ে থাকে। আর তাই Beth Israel Lahey Health Winchester Hospital কর্তৃক প্রদত্ত বয়সভিত্তিক আরেকটি চার্ট রয়েছে তা নিচে উল্লেখ করা হলো

বয়স চর্বির পরিমাণ
২০-৩৯ বছর ৮-১৯ শতাংশ
৪০-৫৯ বছর ১১-২১ শতাংশ
৬০-৭৯ বছর ১৩-২৪ শতাংশ

শরীরে অতিরিক্ত চর্বি আছে কিনা তা পরিমাপের উপায় কি?

শরীরে অতিরিক্ত চর্বি আছে কিনা তা পরিমাপের উপায় কি

চর্বি পরিমাপের অনেক গুলো পদ্ধতি রয়েছে। তবে অধিকাংশ পদ্ধতিই অনেক ব্যয়বহুল আর তাই সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি গুলো নিয়ে এই পর্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।

Skinfold calipers:

এটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত এবং কার্যকরী পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। এই পদ্ধতিতে বিশেষ একধরনের স্কেল/যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে শরীরে চর্বির পরিমাণ নির্ণয় করা হয়ে থাকে। তবে সঠিক ভাবে পরিমাপের জন্য অবশ্যই একজন দক্ষ ফিটনেস এক্সপার্ট এর সহায়তায় এই পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।

 

BMI:

এই পদ্ধতিতে খুব সহজেই নিজে নিজেই পরীক্ষা করা যায়।
এই পদ্ধতিতে শরীরের উচ্চতা অনুযায়ী ওজন ঠিক আছে কিনা তা জানা যায় তবে শরীরে প্রকৃতপক্ষে কি পরিমাণে চর্বি রয়েছে তা জানা যায় না।
তবুও এই পদ্ধতিটি বেশ প্রচলিত কারণ এর মাধ্যমে খুব সহজেই ফিটনেস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এই পদ্ধতিতে প্রথমে শরীরের উচ্চতা মেপে তা মিটারে রূপান্তরিত করে নিতে হবে।
অতঃপর শরীরের ওজন (কিলোগ্রাম) মেপে নিচের সূত্র অনুযায়ী খুব সহজেই BMI বের করা যায়।

সূত্র: শরীরের ওজন ÷ উচ্চতা (মিটার)^২

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) এর তথ্য অনুযায়ী BMI স্কেলের মানের সাথে স্বাস্থ্য অবস্থার চার্ট নিচে তুলে ধরা হলো। (Lindberg, 2019)

ক্যাটাগরি BMI মান
অপুষ্টি/কম ওজন ১৮.৫ বা তার নিচে
স্বাস্থ্যসম্মত ১৮.৫ থেকে ২৪.৯
অতিরিক্ত ওজন ২৫ থেকে ২৯.৯
স্থূলতা (Obese) ৩০ বা তার বেশি

 

পেটের চর্বি কমানোর জন্য ব্যায়ামের গুরুত্ব কতটুকু?

পেটের চর্বি কমানোর জন্য ব্যায়ামের গুরুত্ব কতটুকু

How important is exercise to reduce belly fat

অতিরিক্ত পরিমাণে ফ্যাট বা চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা হলে তা শরীরের মধ্যে (বিশেষত ত্বকের নিচে) জমা হতে থাকে।
সাধারণত অলস জীবন যাপনকারী মানুষের ক্ষেত্রে পেটে চর্বি জমার প্রবণতা দেখা যায়।
পেটে চর্বি জমলে তা যেমন দেখতে খারাপ দেখা যায় তেমনি ভাবে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষত পেট ও কোমড়ে অধিক পরিমাণে চর্বি জমে যাওয়া হৃদরোগের ঝুঁকির সংকেত দেখায়।
পেটে চর্বি জমলে তা থেকে উত্তরণের জন্য যেমন ডায়েট (খাদ্যাভ্যাস) নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি তেমনি জরুরি হলো নিয়মিত ব্যায়াম করা।

কোন ধরনের ব্যায়াম পেটের চর্বি কমাতে সহায়তা করবে এই বিষয়ে অনেকের মনেই নানাবিধ সংশয় রয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে শুধুমাত্র পেটের মাংসপেশী গুলো সম্পৃক্ত থাকে এমন ব্যায়ামের মাধ্যমে পেটের চর্বি কমানো সম্ভব। বস্তুত যে কোনো ধরনের ব্যায়াম ই পেটের চর্বি কমাতে সহায়তা করতে সক্ষম। কারণ ব্যায়ামের ফলে শরীরের মাংসপেশী সচল হয় আর এমতাবস্থায় শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণে ক্যালরির চাহিদা দেখা দেয়। আর তখন শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম অনুযায়ী চর্বি দ্রবীভূত হয়ে ক্যালরিতে রূপান্তরিত হতে থাকে। এভাবে নিয়মিত ব্যায়াম করার মাধ্যমে পেটের চর্বি কমতে থাকে এবং আকর্ষণীয় শরীরের গঠন দেখতে পাওয়া যায়। (OTEY, 2020)

অতিরক্ত ভুঁড়ি কমানোর ২০ টি কারকরী উপায় সম্পর্কে জানুন

উল্লেখ্য যে ব্যায়ামে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মাংশ পেশীর সংকোচন প্রসারণ হয় সেই ব্যায়ামে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ক্যালরি ব্যয় হতে থাকে এবং সেই সাথে চর্বি কমতে থাকে।
যেমন: দৌড়ানো, সাতার কাটা, বাইসাইকেল চালানো ও ব্যায়ামাগারে বিভিন্ন ব্যায়ামের উপকরণ ব্যবহার করা ইত্যাদি।
তবে অবশ্যই সময়, সুবিধা ও শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম করতে হবে।
বয়স্ক মানুষের জন্য মৃদু প্রকৃতির ব্যায়াম হিসেবে হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে উঠা/নামা, সাতার ইত্যাদি নিরাপদ ও কার্যকরী হবে।

খাবারের মূখ্য উপাদান গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি উপাদান হলো ফ্যাট বা চর্বি।
শরীরের কার্যক্রম বজায় রেখে সুস্থ থাকার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণ করা উচিত, তবে তা যেনো হয় আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট।
তবে কম মাত্রায় স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ করা যেতে পারে কিন্তু ট্র্যান্স ফ্যাট গ্রহণ করা উচিত নয়।
সেই সাথে শরীরের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সৌন্দর্য রক্ষার্থে পরিমিত মাত্রায় চর্বি জাতীয় খাবার খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে।

 

 

 

-References

Leonard, J. (2018, June 28). What are the most healthful high-fat foods? Retrieved from Medical News Today: medicalnewstoday.com/articles/322295

Lindberg, S. (2019, Aug 16). What Is My Ideal Body Fat Percentage? Retrieved from Healthline: healthline.com/health/exercise-fitness/ideal-body-fat-percentage

Madell, R. (2020, Sept 2). Good Fats, Bad Fats, and Heart Disease. Retrieved from Healthline: healthline.com/health/heart-disease/good-fats-vs-bad-fats

OTEY, D. (2020, Jun 24). These 16 Exercises Will Help You Blast Belly Fat. Retrieved from Men’shealth: menshealth.com/fitness/a19538914/lose-belly-fat-two-exercises/

Last Updated on May 15, 2022

Was this article helpful?
YesNo