কিসমিস (Raisins) খুবই মজাদার এবং নানাবিধ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন শুকনো প্রকৃতির একটি খাবার যা মূলত আঙ্গুর (Grapes) থেকে তৈরি করা হয়। তাহলে কি আঙ্গুর খাওয়া ভালো নাকি কিসমিস সেরা খাবার?

এই অনুচ্ছেদে কিসমিস খেলে কি হয় এবং কিসমিস খাওয়ার নিয়ম ও উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেই সাথে অনুচ্ছেদের শেষের দিকে আঙ্গুর বনাম কিসমিসের পুষ্টিগুণ বিষয়ক তুলনামূলক পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।

কিসমিসের উপকারিতা

প্রতি ১০০ গ্রাম পরিমাণ কিসমিস থেকে ২৯৯ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। সেই সাথে এতে রয়েছে ৭৯ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ৩.১ গ্রাম প্রোটিন, ০.৫ গ্রাম ফ্যাট, ১১ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ৭৪৯ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম সহ সামান্য পরিমাণে অন্যান্য মিনারেলস এবং ভিটামিন। যেমন: ভিটামিন বি, সি, ই, কে ইত্যাদি। কিসমিস খাওয়ার উপকারিতা সমূহ নিচে ধারাবাহিক ভাবে বর্ণনা করা হলোঃ (Firdous, 2020)

১. হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায়

উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে জটিলতর হার্টের রোগ যেমন হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। কিন্তু আপনি যদি নিয়মিত কিসমিস খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে এতে বিদ্যমান পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে হার্টের রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে। এছাড়াও এতে সোডিয়ামের পরিমাণ খুবই সামান্য যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় না বরং এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে যা রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হার্ট ভালো রাখে।

২. ক্যান্সার প্রতিরোধ করার উপায়

কিসমিস অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর খুব ভালো একটি উৎস। বিশেষত এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে Phenolic phytochemicals রয়েছে যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর ফ্রি র‌্যাডিক্যালস এর বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধ করে থাকে। এছাড়াও নিয়মিত কিসমিস খাওয়ার ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। যার ফলে সহজেই শরীরে রোগজীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে না এবং সেই সাথে রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।‌

৩. ত্বক, চুল ও চোখ ভালো রাখে

কিসমিসের মধ্যে resveratrol নামক বিশেষ একটি উপাদান রয়েছে যা ত্বক ও চুলের যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিয়মিত কিসমিস খাওয়ার ফলে ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়, মাথায় খুশকি হওয়ার প্রবণতা দূর হয় এবং চুল পড়া কমে যায়। এছাড়াও কিসমিসে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর উপস্থিতি বার্ধক্য জনিত চোখের ঝাপসা দৃষ্টি এবং ছানিপড়া রোগ (Cataract) প্রতিরোধে সহায়তা করে।

৪. রক্তস্বল্পতা (Anemia) দূর করে

কিসমিসের মধ্যে আয়রন (Iron) এবং ভিটামিন বি রয়েছে যা শরীরে রক্ত কণিকা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর তাই গর্ভবতী মহিলাদের জন্য এটি খুব ভালো একটি খাবার হতে পারে। কেননা গর্ভাবস্থায় অধিকাংশ মহিলার ক্ষেত্রেই রক্তস্বল্পতা (Anemia) দেখা যায়। তবে গর্ভবতী ছাড়াও যেকোনো নারী ও পুরুষের জন্য শরীরে রক্ত উৎপাদন ভালো রাখতে কিসমিস খাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও কিসমিসের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ‘ভিটামিন কে’ রয়েছে যা কেটে যাওয়া ক্ষতস্থানে রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে।

৫. পুরুষের যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে

কিসমিস হলো প্রাকৃতিক যৌন উদ্দীপক (Aphrodisiac) খাবার যা একজন পুরুষের ক্ষেত্রে যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। বিশেষত লিঙ্গে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি করার মাধ্যমে লিঙ্গ উত্থান জনিত সমস্যা (ED- erectile dysfunction) দূর করে। সেই সাথে এতে বিদ্যমান arginine নামক বিশেষ একটি উপাদান শুক্রাণুর গুণগত মান বৃদ্ধি করে যা সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক।

লিঙ্গ উত্থানে সমস্যা কেন হয় এবং কিভাবে তা প্রতিরোধ করা যায় সেই বিষয়ে বিস্তারিত ভাবে জানতে এই অনুচ্ছেদটি পড়ুন।

৬. দাঁতের সমস্যা দূর করে

কিসমিসের জীবাণু বিরোধী ক্ষমতা মুখের ভেতরে তথা দাঁত ও মাড়িতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিহত করে।‌ সেই সাথে এতে রয়েছে Oleanolic acid এবং ফ্লুরাইড যা দাঁত ক্ষয় হওয়া প্রতিরোধ করে। কিসমিসের মধ্যে আরো রয়েছে ক্যালসিয়াম ও বোরন যা দাঁতের গঠন ঠিক রাখে এবং দাঁত চকচকে ও উজ্জ্বল দেখায়।

উল্লেখ্য, কিসমিসের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট রয়েছে আর তাই কিসমিস খাওয়ার পর তা যেন দাঁতে লেগে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখবেন, কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার মুখের ভেতরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর তাই এই জাতীয় খাবার গ্রহণের পর প্রয়োজনে ব্রাশ করতে হবে।

৭. শিশুদের জন্য বিশেষ উপকারী

শিশুরা প্রায়ই ক্যান্ডি বা এই জাতীয় খাবার খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে‌‌। এগুলোর পরিবর্তে কিসমিস খাওয়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন যা একাধারে শিশুর কাছে খেতে মজাদার মনে হবে এবং সেই সাথে এর মধ্যে থাকা বোরন (Boron) শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশে সহায়তা করবে। এছাড়াও এটি খাবার হজম করতে এবং ক্ষুধা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। যার মাধ্যমে আপনার শিশুর ক্ষেত্রে খাবারের প্রতি অনীহা সমস্যার চমৎকার একটা সমাধান পেয়ে যাবেন।

কিসমিস খাওয়ার নিয়ম

কিসমিস খাওয়ার নিয়ম

কিসমিস খাওয়ার নিয়ম কি তা জানার পূর্বে কিসমিস কিভাবে তৈরি হয় সেই সম্পর্কে একটু ধারণা থাকতে হবে। আঙ্গুর শুকিয়ে কিসমিস বানানো হয় এবং তা দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণের জন্য কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আর তাই কিসমিস খাওয়ার আগে অবশ্যই পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া উচিত। আপনি চাইলে পানির সাথে কিছুটা আপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে কিসমিস ধুয়ে নিতে পারেন। এর মাধ্যমে কেমিক্যাল এবং বাইরে লেগে থাকা ময়লা ভালো ভাবে দূর হবে।

কিসমিস যখন খুশি এবং যেভাবে আপনার ভালো লাগে সেভাবে খেতে পারেন। যেমনঃ স্ন্যাকস হিসেবে সরাসরি কয়েকটি কিসমিস নিয়ে খাওয়া অথবা কেক, মিষ্টান্ন ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহার করা ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো রাতে পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে খাওয়া।

কিসমিস ভিজিয়ে খাওয়ার উপকারিতা

কিসমিস ভিজিয়ে খাওয়ার মাধ্যমে কিছু বিশেষ উপকারিতা পাওয়া যায়। যেমনঃ

এসিডিটি দূর করে

সকালে খালি পেটে পানিতে ভিজিয়ে রাখা কিসমিস পানি ‌সহ খেলে তা পাকস্থলীতে অতিরিক্ত এসিডের উপস্থিতি কমাতে সহায়তা করে। যার মাধ্যমে এসিডিটির সমস্যা দূর হয়।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে

সাধারণত হজমে সমস্যার কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়ে থাকে। কিসমিসের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে যা হজমে সহায়তা করার মাধ্যমে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

শক্তি জোগায়

সকালে ঘুম থেকে উঠে যারা হাঁটতে বের হন অথবা ব্যায়াম করেন তাদের জন্য কিসমিস অসাধারণ একটি খাবার। কারণ, এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি রয়েছে এবং তা খুব দ্রুত শরীরে শক্তি যোগায়।‌ যার ফলে ব্যায়াম করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

লিভার ভালো রাখার উপায় কিসমিস

লিভার এবং কিডনি শরীরের খুব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই দুটো অঙ্গ শরীরকে রোগমুক্ত এবং সুস্থ রাখতে রক্তে থাকা বিষ এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ দূর করে রক্তকে পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। কিসমিসে ভেজানো পানি পান করা রক্ত পরিষ্কার করতে এবং লিভারকে সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করতে পারে। (Link, 2021) আপনি যদি মাসে কমপক্ষে একবার টানা চার দিন কিসমিসে ভেজানো পানি পান করেন, তাহলে এটি আপনার লিভারকে আরো ভালভাবে কাজ করতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে, শরীর যখন ভারী বোধ হয় কিংবা হজমে সমস্যা দেখা দেয়, তখন এই পানীয়টি পান করার মাধ্যমে আপনি নিজেই শরীরে ভাল পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে যাবেন। তো চলুন দেখে নেয়া যাক, কিসমিসের পানি কিভাবে তৈরি করবেন।

যা যা লাগছেঃ

– ২ কাপ বা ৪০০ মিলি বিশুদ্ধ পানি এবং

– ১৫০ গ্রাম কিসমিস

 

যেভাবে প্রস্তুত করবেনঃ

প্রথমেই খুব সাবধানতার সাথে ভালো কিসমিস বেছে নিন। দেখতে গাঁড় বর্ণের কিসমিসগুলো বেছে নিন যেগুলো খুব বেশি শক্তও না আবার নরমও না। খেয়াল রাখবেন, কিসমিসগুলো যেন পরিষ্কার হয় এবং ভাঙ্গা না হয়। এবার, কিসমিসগুলো ধুয়ে নিন।

অতঃপর, একটি প্যানে পানি বসিয়ে ফুটতে শুরু করা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তারপর ফুটন্ত পানিতে কিসমিসগুলো ছেড়ে দিয়ে ২০ মিনিটের জন্য হালকা আঁচে রেখে দিন। তারপর চুলা বন্ধ করে সারারাত এভাবেই রেখে দিন। সকালে পানি থেকে কিসমিস ছেঁকে আলাদা করে নিন এবং পানি হালকা গরম করে নিন। আপনি এটি হালকা গরম অবস্থায় পান করতে পারেন, তবে অবশ্যই ঘুম থেকে ওঠার পর খালি পেটে এটি পান করবেন। এবং এটি পান করার ৩০ মিনিট পর সকালের নাস্তা করে নিবেন। একটানা ৪ দিন এটি পান করতে ভুলবেন না।

কিসমিস বনাম আঙ্গুর

Raisins vs. grapes

আঙ্গুর থেকে কিসমিস তৈরি হলেও এই দুই এর মধ্যে পুষ্টিগুণ বিচারে কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমনঃ

✓ আঙ্গুরের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পানি রয়েছে। কিন্তু কিসমিসে তুলনামূলক পানির পরিমাণ বেশ কম।‌

✓ প্রতি ১০০ গ্রাম বিবেচনায় আঙ্গুরের তুলনায় কিসমিসের মধ্যে বেশি পরিমাণে ক্যালরি, ফাইবার, কার্বোহাইড্রেট সহ প্রায় সকল উপাদান (প্রোটিন, মিনারেলস, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ইত্যাদি) বেশি রয়েছে।

✓ আবার তাপে কিছু কিছু পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যায় বলে আঙ্গুরের তুলনায় কিসমিসের মধ্যে ভিটামিনের পরিমাণ কম রয়েছে।

যা হোক, আঙ্গুর এবং কিসমিস দুইটাই বেশ পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাবার। তবে যেহেতু কিসমিসের মধ্যে বেশি পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট ও ক্যালরি রয়েছে, আর তাই যাদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস এবং শরীরের ওজন বেড়ে যাচ্ছে তাদের জন্য কিসমিসের তুলনায় আঙ্গুর খাওয়া উত্তম। পক্ষান্তরে যাদের শরীরে দ্রুত শক্তি উৎপাদনের প্রয়োজন বা যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে রাতের বেলায় অথবা সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্যায়াম করতে চান তাদের জন্য কিসমিস খুবই উপকারী খাবার হতে পারে।

 

References

Firdous, H. (2020, 08 05). Health Benefits of Raisins And Its Side Effects. From lybrate: https://www.lybrate.com/amp/topic/raisins-benefits#origin-and-cultivation-of-raisins

Link, R. (2021, 7 8). What Is Raisin Water, and Does It Have Benefits? From Healthline: https://www.healthline.com/nutrition/raisin-water

 

Last Updated on July 25, 2022

Was this article helpful?
YesNo