আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) কি?

আইবুপ্রোফেন NSAID (non-steroidal anti-inflammatory drugs) গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত একটি ওষুধ যা মৃদু প্রকৃতির ব্যথা ও জ্বরের জন্য উপশম দায়ক হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। এটি একটি ওটিসি (OTC- over the counter) ওষুধ যা চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত সংগ্রহ ও ব্যবহার করা যায়। তবে যথাযথ ব্যবহার না হলে সেক্ষেত্রে এই ওষুধ শরীরের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বহুল প্রচলিত এই ওষুধের সঠিক ব্যবহার ক্ষেত্র ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। এই অনুচ্ছেদে আইবুপ্রোফেনের ব্যবহার ও সতর্কতা সমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে যা আপনাকে এর নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

 

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করেছে। যার মধ্যে আইবুপ্রোফেন অন্যতম। (Brazier, 2021) আইবুপ্রোফেন হলো ওষুধের মুল উপাদান তবে ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বাণিজ্যিক নামে ইহা বাজারজাত করে থাকে। সাধারণত এ্যাডভেল (Advel), ফ্লামেক্স (Flamex), নিওরোফেন (Nurofen), প্রোফেন (Profen), ইনফ্লাম (Inflam), ইত্যাদি নামে এই ওষুধ বাজারে পাওয়া যায়।

আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) কি? আইবুপ্রোফেন ওষুধ এর ব্যবহার ও সতর্কতা

আইবুপ্রোফেন ওষুধ এর ব্যবহার

আইবুপ্রোফেন একটি প্রদাহ নাশক ঔষধ। প্রদাহ (inflammation) বলতে বোঝায় আঘাত অথবা ইনফেকশন জনিত কারণে শরীরের কোনো স্থান লাল হয়ে যাওয়া, ফোলাভাব (swelling), ব্যথা, আক্রান্ত স্থান গরম ও স্পর্শকাতর (sensitive to touch) হয়ে যাওয়া। প্রদাহের প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়াই NSAID গ্রুপের এই ওষুধটি ব্যবহার করা যায়। এবং তা উপশম দায়ক ওষুধ হিসেবে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদী অথবা তীব্র মাত্রার প্রদাহের ক্ষেত্রে এন্টি বায়োটিক ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে যা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে।

প্রদাহ ছাড়াও জ্বর এবং মৃদু প্রকৃতির ব্যথার ক্ষেত্রে উপশম দায়ক ওষুধ হিসেবে আইবুপ্রোফেন বিশেষ ভূমিকা রাখে। যে সমস্ত ক্ষেত্রে এই ওষুধ ব্যবহার করা যায় তা উল্লেখ করা হলো।

  • যে কোন ধরনের জ্বরের প্রাথমিক অবস্থায় বিশেষত আঘাত বা ইনফেকশন জনিত জ্বর এর ক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য। উপরন্তু টিকা নেওয়ার পরবর্তী জ্বর ও ব্যথা কমাতেও এটি ব্যবহার করা যায়।
  • বিভিন্ন ধরনের ব্যথা যেমন আঘাত জনিত ব্যথা, মাথা ব্যথা, দাঁত ব্যথা, হাঁটু ও কোমড়ে ব্যথা, মাংস পেশীর ব্যথা ইত্যাদি।
  • মহিলাদের ক্ষেত্রে মাসিকের ব্যথা কমাতে বিশেষ সহায়তা করে।

আইবুপ্রোফেন ওষুধটি জ্বর, ব্যথা ও প্রদাহ নাশক হিসেবে উপরে উল্লেখিত ক্ষেত্র সমুহের জন্য মুলত দুই ভাবে ব্যবহার করা যায়। যথা:

১। অভ্যন্তরীণ প্রয়োগ যা ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল আকারে মুখে সেবন করা যায়। এছাড়াও ইনজেকশনের মাধ্যমে সরাসরি রক্তে প্রয়োগ অথবা পায়ুপথে সাপোজিটরি (suppository) ব্যবহার করা যায়।

২। বাহ্যিক ব্যবহার যা সাধারণত ব্যথার স্থানে জেল অথবা স্প্রে আকারে প্রয়োগ করা হয়। অভ্যন্তরীণ ওষুধ সেবনের পাশাপাশি বাহ্যিক ব্যবহার ব্যথা নিরাময়ের জন্য দ্রুত কার্যকরী হয়ে থাকে।
Ibuprofen 400mg

আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) ওষুধ কিভাবে কাজ করে?

আইবুপ্রোফেন জ্বর, ব্যথা ও‌ প্রদাহ নাশক হিসেবে নিরাপদ ও দ্রুত কার্যকরী একটি ওষুধ। National Health Service of UK এর তথ্য অনুযায়ী আইবুপ্রোফেন মুখে সেবনের পরবর্তী ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে এর কার্যকারিতা শুরু করে। শরীরের অভ্যন্তরে কিভাবে কাজ করে এই জাদুকরী ওষুধটি? প্রথমত ওষুধ সেবনের পরে‌ তা রক্তের সাথে মিশে যায় এবং সারা শরীরে প্রবাহিত হতে থাকে। মুলত এই ওষুধটি কাজ করে ব্যথা উৎপাদনে সহায়তাকারী হরমোনের নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে। আক্রান্ত স্থানে Prostaglandin নামক একধরনের হরমোন উৎপন্ন হয় যা প্রদাহ ও ব্যথার সৃষ্টি করে থাকে।‌ আইবুপ্রোফেন এই হরমোন উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে যার ফলে ব্যথা ও জ্বরের উপশম হয়।

উপকারী কার্যক্রমের বিপরীতে এই ওষুধ শরীরের অভ্যন্তরে কিছু জটিলতাও সৃষ্টি করতে পারে। যেমন:

  • ক্রমাগত ব্যবহার হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
  • পাকস্থলী ও অন্ত্রের (intestines) উপর খারাপ প্রভাব ফেলতে থাকে। বিশেষত পাকস্থলীতে ক্ষত (ulcer) সৃষ্টি করতে পারে।

ওষুধের মাত্রা বা ডোজের নির্দেশাবলী

ওষুধের মাত্রা বা ডোজ নির্ভর করে রোগের ধরন ও রোগীর বয়স অনুযায়ী।
ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়িয়ে ওষুধের সুফল পাওয়ার জন্য সঠিক মাত্রায় ওষুধ সেবন করা জরুরী।
ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS-UK) এর নির্দেশনা অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য আইবুপ্রোফেন গ্রহণের মাত্রা নিম্নরূপ।

  • সাধারণত 200mg এর একটি অথবা দুটি (প্রয়োজন মাফিক) করে ট্যাবলেট দৈনিক ৩ বার সেবনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
    এক্ষেত্রে ওষুধ সেবনের মধ্যবর্তী দূরত্ব অবশ্যই ৬ ঘন্টা হতে হবে।
  • মাঝারি প্রকৃতির ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সর্বোচ্চ 400mg করে ওষুধ দৈনিক ৪ বার করে সেবন করা যায়। সেক্ষেত্রে দুই ডোজের অন্তর্বর্তী দূরত্ব সর্বনিম্ন ৪ ঘন্টা হওয়া উচিত।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরো উচ্চ মাত্রায় সেবন করা যায়। সেক্ষেত্রে 600mg দৈনিক ৪ বার করে নির্দেশিত হয়ে থাকে।
  • সার্বক্ষণিক ব্যথার জন্য চিকিৎসক ধীর গতিতে কার্যকরী ওষুধ সেবনের নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে ১০ থেকে ১২ ঘন্টা অন্তর অন্তর দৈনিক ২ বার ওষুধ সেবন করতে হয়।
  • তবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ গ্রহণের মাত্রা 3200mg নির্ধারণ করা হয়েছে যা কমপক্ষে ৪ বারে গ্রহণ করতে হবে।‌ প্রতিবারে সর্বোচ্চ 800mg করে ওষুধ ৪ ঘন্টা অন্তর অন্তর সেব্য।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অবশ্যই তুলনামূলক কম মাত্রায় ওষুধ সেবন করতে হবে। তিন মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য আইবুপ্রোফেন প্রযোজ্য নয়। বয়স তিন মাসের বেশি হলে সেক্ষেত্রে সিরাপ প্রযোজ্য হবে। সাত বছরের বেশি বাচ্চাদের বেলায় ট্যাবলেট সেবন করা যেতে পারে। বাচ্চার বয়স ও ওজন অনুযায়ী ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

  • ৩ থেকে ১১ মাস বয়স পর্যন্ত 5ml সিরাপ ৩-৪ বার সেব্য।
  • ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত 5ml করে ৩ বার সেবন করা যায়।
  • ৪ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত 5ml সিরাপ দৈনিক ৩ বার সেব্য।
  • ৭ থেকে ৯ বছরের বাচ্চাদের জন্য 200mg ট্যাবলেট ২৪ ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৩ বার সেবন করা যায়।
  • ১০ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে 200-300mg দৈনিক ৩ বার সেব্য।

ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে সতর্কতা সমুহ

ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে কিছু বিশেষ নির্দেশনা ও সতর্কতা রয়েছে যা নিম্নে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

  • একদম খালি পেটে ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। কিছু খাবার গ্রহণ করার পরে ওষুধ সেবন করতে হবে।
  • ওষুধের ডোজ ভুলে গেলে পরবর্তী ডোজের সময় দুই ডোজ একসাথে গ্রহণ করা যাবে না।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত ১০ দিনের বেশি সময় ধরে আইবুপ্রোফেন ট্যাবলেট গ্রহণ করা উচিত নয়।
  • সপ্তাহের বেশি সময় পর্যন্ত বাহ্যিক ভাবে স্প্রে বা জেল ব্যবহার করা যাবে না।
  • ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষদের জন্য এই ওষুধ সেবন করা বিপদজনক বিশেষত তা পাকস্থলীতে ক্ষত (ulcer) সৃষ্টি করতে পারে।
  • এসপিরিন(aspirin) ও আইবুপ্রোফেন একসাথে সেবন করা উচিত নয়। (Barrel, 2019)
  • বসন্ত (chickenpox) রোগীদের জন্য আইবুপ্রোফেন সেবন করা থেকে বিরত থাকা উচিত।

আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলি কি কি?

দীর্ঘদিন ধরে সেবনের ফলে আইবুপ্রোফেন শরীরের উপর কিছু খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে বিশেষত পাকস্থলী, লিভার ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অংগ সমুহের ক্ষতিসাধন করতে পারে। যেমন:

  • দীর্ঘদিন ধরে আইবুপ্রোফেন সেবনের ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় যার ফলে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যেতে পারে। এছাড়াও প্রস্রাব কমে যাওয়া, ঝিমুনি ভাব ও শরীরে পানি স্বল্পতার সৃষ্টি হয়।
  • পাকস্থলী ও অন্ত্রে ক্ষত সৃষ্টি হয় যার ফলে রক্তপাত হতে পারে।
  • কারো কারো ক্ষেত্রে এলার্জিক রিয়েকশন দেখা দিতে পারে।
  • কদাচিৎ লিভারের ক্ষতি সাধন করে থাকে যার লক্ষণ হিসেবে বমি বমি ভাব, চুলকানি, ক্লান্তি, ও পেটে ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

 

ক্ষতিকর প্রভাব ও জটিলতা এড়াতে যথাযথ জ্ঞান অর্জন ও সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত। কখন‌, কি কি উপসর্গ দেখা দিলে ওষুধ সেবন বন্ধ করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত সে‌ বিষয়ে নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

  • বমি বমি ভাব ও বমি
  • পেটে ব্যথা (stomach pain)
  • বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও দুর্বলতা বোধ হওয়া
  • বমি অথবা মলের সাথে রক্ত যাওয়া
  • ১০ দিনের বেশি সময় ধরে ব্যথা থাকলে
  • ওষুধ সেবনের ৩ দিনের মধ্যেও জ্বর না কমলে
  • শরীরের কোনো অংশে অস্বাভাবিক ফোলাভাব বা ত্বকের রং পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলে
  • Allergic reaction যেমন হাঁচি, মুখমণ্ডল ফুলে যাওয়া, চুলকানি ইত্যাদি দেখা দিলে সাথে সাথে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

Ibuprofen 400mg কি?

মুখে সেবনের জন্য বিভিন্ন পরিমাণে ও বিভিন্ন আকারে (ট্যাবলেট, ক্যাপসুল) ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান আইবুপ্রোফেন তৈরি করে থাকে। তারমধ্যে ibuprofen 400mg একটি বহুল ব্যবহৃত পরিমাণের মাত্রা হিসেবে পরিগণিত হয়। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক 400mg পরিমাণের ৩-৪ মাত্রা ওষুধ নির্দেশিত হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে 400mg পরিমাণের একটি করে ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল প্রতিবারে সেবন করা যায়।

Ibuprofen 400mg প্রধান বৈশিষ্ট্য কি?

সাধারণত এটি মৃদু থেকে মাঝারি প্রকৃতির ব্যথা যেমন মাংস পেশীর ব্যথা, বাতব্যথা (Arthritis), কোমড় ব্যথা ও দাঁত ব্যথার ক্ষেত্রে নির্দেশিত হয়ে থাকে। ১২ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের জন্য এই‌ মাত্রার ওষুধ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়।

Ibuprofen 400 mg কি ভাবে কাজ করে?

মুখে ওষুধ সেবনের পরে তা পাকস্থলী ও অন্ত্রের মাধ্যমে রক্তের সাথে মিশে যায়। অতঃপর আক্রান্ত স্থানে পৌঁছে ব্যথা উৎপাদনে সহায়তাকারী হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। যার ফলে ব্যথা ও জ্বরের উপশম হয়ে থাকে।

Ibuprofen 400 mg খাবারের নিয়ম

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতি বারে একটি করে ওষুধ দৈনিক ৩ বার ৬ ঘন্টা অন্তর অন্তর সেবন করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৪ বার পর্যন্তও সেবন করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে ওষুধ সেবনের অন্তর্বর্তী দূরত্ব নূন্যতম ৪ ঘন্টা হতে হবে।

400mg ট্যাবলেট অবশ্যই পানি সহযোগে সরাসরি গিলে খেয়ে ফেলতে হবে। কোন অবস্থাতেই চিবিয়ে, কামড়িয়ে অথবা চুষে খাওয়া যাবে না। কেননা তা মুখে অস্বস্তি ও গলায় জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে।

Ibuprofen 400mg পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

প্রায় প্রত্যেক ওষুধের কম-বেশি কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। Ibuprofen 400mg ওষুধটিও এর ব্যতিক্রম নয়। সাধারণত এই ওষুধ সেবনের ফলে যে সমস্ত উপসর্গ গুলো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিতে পারে তা নিচে দেওয়া হলো। উল্লেখ্য খাবার, দুধ, শরবত অথবা ফলের রসের সাথে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। (Illinois, 2019)

  • বুকজ্বালা (heartburn)
  • বমি বমি ভাব অথবা বমি
  • পেটে গ্যাস হওয়া ও পেট ব্যথা
  • কোষ্ঠকাঠিন্য অথবা ডায়রিয়া
  • ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়া
  • পা ফুলে যাওয়া (edema)
  • দুর্বলতা ও ঝিমুনি ভাব
  • মনোযোগের অভাব হওয়া

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মৃদু প্রকৃতির হলে সেক্ষেত্রে চিন্তিত হওয়ার কিছুই নেই। তবে বেশি সমস্যা বা তীব্র উপসর্গ দেখা দিলে ওষুধ বন্ধ করা উচিত। সেই সাথে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখ্য, আইবুপ্রোফেন ওষুধটি সেবনের পরে গাড়ি চালানো (driving) থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ, ওষুধ সেবনের ফলে উদ্ভূত ঝিমুনি ভাব দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

Ibuprofen 600mg কি?

আইবুপ্রোফেন 600mg উচ্চ মাত্রার ওষুধ যা সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দেশিত হয়ে থাকে।
আইবুপ্রোফেন এর নিম্নমাত্রার ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সেবন করা গেলেও উচ্চমাত্রার ওষুধ
যেমন 400mg এবং 600mg চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সেবন করা অনুচিত।
তবে 600mg ট্যাবলেট ক্ষেত্রবিশেষে দুই ভাগে ভাগ করে সেবন করা যেতে পারে যেখানে 300mg মাত্রা নির্দেশিত হয়ে থাকে।
উল্লেখ্য, বেশি মাত্রার (600 mg) ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে সেবনের ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ক্ষতিকর প্রভাব সমুহের সম্ভাবনা বেশি থাকে।‌

গর্ভবতী মহিলাদের মধ্যে Ibuprofen এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

গর্ভাবস্থায় আইবুপ্রোফেন সেবন করা যাবে কি? গর্ভকালীন সময়ে জ্বর বা ব্যথা নিরাময়ের জন্য আইবুপ্রোফেন ব্যবহার করা উচিত নয়।
কারণ তা গর্ভস্থ সন্তানের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষত গর্ভের ৩০ সপ্তাহ বা তার পরবর্তী সময়ে আইবুপ্রোফেন সেবনের ফলে সন্তানের হার্ট ও রক্তনালীতে গঠনগত ত্রুটি হতে পারে।
এছাড়াও গর্ভকালীন সময়ের শুরুর দিকে এই ওষুধ গ্রহণের ফলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভকালীন সময়ে জ্বর ও ব্যথা নিরাময়ের জন্য নিরাপদ হবে এমন ওষুধ ব্যবহার করা উচিত।
উল্লেখ্য, গর্ভকালীন সময়ে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়।

আইবুপ্রোফেন এবং প্যারাসিটামল ওষুধ কিভাবে কাজ করে?

আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামল প্রাথমিক চিকিৎসার উপকরণ হিসেবে বহুল ভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
সাধারণত জ্বর ও ব্যথা নিরাময়ের জন্য এই ওষুধ দুইটি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে কার্যকারিতা ও ব্যবহার বিধির উপর ভিত্তি করে এদের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
যেমন:

১।আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen) ওষুধের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রদাহনাশ করা।
এছাড়াও এটি জ্বর ও ব্যথা কমাতেও কার্যকর হয়ে থাকে।
অপরদিকে প্যারাসিটামলের প্রদাহ নাশক ক্ষমতা কম তবে জ্বরের ক্ষেত্রে
তাপমাত্রা কমাতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।

২। ব্যথা কমাতে বিশেষত কোমড় ব্যথা (back pain) ও মাসিকের ব্যথার ক্ষেত্রে প্যারাসিটামলের তুলনায় আইবুপ্রোফেন বেশি কার্যকর।

৩। আইবুপ্রোফেন ৬ মাসের কম বয়সী বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নয়।অপরদিকে প্যারাসিটামল সব বয়সের জন্য ব্যবহার করা যায় তবে ২ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করতে হবে।

৪। আইবুপ্রোফেনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া প্যারাসিটামলের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি ‌যা কিডনি, পাকস্থলী ও হার্টের ক্ষতি করে। তবে লিভারের রোগীর জন্য প্যারাসিটামল অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।

 

Ibuprofen vs paracetamol

জ্বরের জন্য আইবুপ্রোফেন বনাম প্যারাসিটামল

জ্বরে আক্রান্ত হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আর জ্বরের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই বিভিন্ন ওষুধ সেবন করা হয়।
জ্বরের জন্য আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামল বহুল প্রচলিত দুইটি ওষুধ।
কিন্তু কোনটি বেশি কার্যকরী? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে জ্বরের কারণ ও তীব্রতার উপর।
আঘাত বা ইনফেকশন জনিত জ্বরের ক্ষেত্রে আইবুপ্রোফেন বেশি কার্যকরী হবে কারণ এর রয়েছে অধিক পরিমাণে ব্যথা ও প্রদাহ নাশক ক্ষমতা।
অপরদিকে ঠান্ডা জনিত অথবা মৃদু প্রকৃতির ভাইরাল জ্বরের ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল বেশি কার্যকরী হতে পারে।
এছাড়াও জ্বরের ক্ষেত্রে যখন তাপমাত্রা অনেক বেশি উঠে যায় তখন প্যারাসিটামল দ্রুত তাপমাত্রা কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
তবে ওষুধ সেবনের ৩ দিনের মধ্যে জ্বর না কমলে সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরের ওষুধ যেমন প্যারাসিটামল ও আইবুপ্রোফেন এর উপর ভরসা করা চলবে না।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টি বায়োটিক ওষুধ সেবন অথবা প্রয়োজন মাফিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

আইবুপ্রোফেন ট্যাবলেট (Ibuprofen Tablet) দাঁত ব্যথা এবং মাসিক ব্যথা এর জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে কি?

নানাবিধ কারণে দাঁত ব্যথা হতে পারে তবে প্রাথমিক ভাবে ব্যথা কমাতে আইবুপ্রোফেন ব্যবহার করা যেতে পারে।সেক্ষেত্রে 400mg পরিমাণে দৈনিক ৩ বার সেবন করতে হবে।‌ ব্যথা কমে গেলে ওষুধ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।উল্লেখ্য, দাঁতের ব্যথা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে সেক্ষেত্রে অবশ্যই একজন দাঁতের ডাক্তারের (Dentist) শরণাপন্ন হতে হবে।‌প্রায় মহিলাদের ক্ষেত্রেই ‌মাসিক শুরুর দিকে তলপেটে ব্যথা অনুভূত হয়ে থাকে।
এই ব্যথা নিরাময়ের জন্য আইবুপ্রোফেন ওষুধ সেবন করা যায় যা ব্যথা কমাতে সহায়তা করে।
তবে তীব্রতর ব্যথা অথবা মাঝে মধ্যেই তলপেটে ব্যথা অনুভব হলে সেক্ষেত্রে একজন গাইনী ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
কেননা, জরায়ু বা ডিম্বাশয়ে টিউমার (cyst) হলেও ব্যথা হতে পারে আর সেক্ষেত্রে আইবুপ্রোফেন সেবনের মাধ্যমে শুধু ব্যথা নিরাময় করা তার সমাধান নয়।
বরং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে রোগ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

 

করোনার ক্ষেত্রে আইবুপ্রোফেন 

আইবুপ্রোফেন কি ‌করোনা প্রতিকারে কার্যকরী হতে পারে? করোনা মহামারীর শুরুর দিকে মনে করা হতো যে করোনা প্রতিকারে আইবুপ্রোফেনের ব্যবহার ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, আইবুপ্রোফেন শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সাম্প্রতিক সময়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে যে আইবুপ্রোফেন সহ NSAID গ্রুপের অন্যান্য ওষুধ সমুহ করোনা ভাইরাসের চিকিৎসায় ব্যবহারে কোন মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না। বরং তা করোনার নানাবিধ লক্ষণ যেমন জ্বর, গলাব্যথা ও প্রদাহ কমাতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে।

এছাড়াও করোনা প্রতিরোধে বর্তমানে সারাবিশ্বে টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
টিকা নেওয়ার পরে মৃদু প্রকৃতির জ্বর ও ব্যথা হতে পারে যা অস্বাভাবিক নয়।
টিকা নেওয়ার পরবর্তী জ্বর ও ব্যথা নিরাময়ে আইবুপ্রোফেন নিরাপদ ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে টিকা নেওয়ার পরে ব্যথা বা জ্বর হতে পারে এই ভেবে টিকা নেওয়ার পূর্বেই আইবুপ্রোফেন সেবন করা যাবে না।

পরিশেষে বলা যায় যে, আইবুপ্রোফেন একটি নিরাপদ ওষুধ হলেও দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করলে তা শরীরের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যবহার বিধি ও সতর্কতা সম্বন্ধে যথাযথ জ্ঞান থাকতে হবে।
আসুন আমরা নিজে জানি ও অপরকে জানতে উৎসাহিত করি।

Last Updated on March 17, 2022

Was this article helpful?
YesNo