মানুষের শরীরের জন্য খাদ্য ও পানি যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো (Sleeping) গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে ঘুম জনিত নানাবিধ সমস্যায় ভুগছেন। এর কারণ হতে পারে অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন পদ্ধতি অথবা ঘুমের নানাবিধ রোগ (sleep disorders) । কম ঘুমানোর ফলে শরীর ও মনে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে থাকে।

এই অনুচ্ছেদে রাতে ঘুম না আসার কারণ ও প্রতিকার এবং পর্যাপ্ত না ঘুমানোর ফলে কি কি সমস্যা হতে পারে সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে বয়স ভেদে ঘুমের আদর্শ পরিসীমা, ভালো ঘুমের উপকারিতা ও ঘুমের ব্যায়াম সংক্রান্ত আলোচনা। সেই সাথে অনুচ্ছেদের শেষের দিকে থাকছে ঘুমের ৫ টি টিপস ও ট্রিক্স (আরো কিছু বোনাস টিপস সহ) যা বিজ্ঞানসম্মত ও সর্বাধিক কার্যকরী।

ভালো ঘুম বলতে কি বুঝায়?

ঘুম হচ্ছে শরীর ও মনের জন্য সর্বোচ্চ বিশ্রাম যা ক্লান্তি দূর করে এবং নতুন ভাবে কাজ করতে উদ্দীপনা জোগায়। ঘুমের অনেকগুলো পর্যায় ও প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন: অনেকেই ঘুমের মধ্যে বার বার চেতন হয়ে থাকে অর্থাৎ সামান্য কিছুতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। আবার অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছেন। বাহ্যিক কোনো শব্দ বা আলোতে সহজেই তাদের ঘুম ভাঙ্গে না। আর এই ধরনের ঘুম হলো সবচেয়ে ভালো ঘুম যাতে করে শরীরের ক্লান্তি দূর হয় এবং সতেজতা ফিরে আসে।

এছাড়াও মেডিকেলের ব্যাখা অনুযায়ী ঘুমের প্রধানত দুইটি পর্যায় রয়েছে। যথা:

  1. Non-REM Sleep: REM for Rapid Eye Movement. এটি হলো ঘুমের প্রথম পর্যায় যখন তুলনামুলক কম গভীর প্রকৃতির ঘুম হয়ে থাকে।‌ এই পর্যায়ের স্থায়ীত্ব সর্বোচ্চ ৯০ মিনিট পর্যন্ত হয়। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে আরো কম বা বেশি হতে পারে।
  2. REM Sleep: এই পর্যায় টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই পর্যায়ে শরীর ও মন পুনরায় কাজ করার জন্য প্রস্তুত হতে থাকে এবং এই পর্যায়েই মানুষ স্বপ্ন দেখে।

 

এই দুই ধরনের ঘুম (REM & non-REM) সারারাত ধরে পর্যায়ক্রমে চলতে থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সারারাতে ৫ থেকে ৬ বার এমন পর্যায় ঘটে থাকে। রাতের গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে REM Sleep এর পর্যায়কাল বাড়তে থাকে। শেষ রাতের দিকে মানুষ সবচেয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকেন। (Holland, 2019)

ভালো ঘুমের উপকারিতা

ঘুম সুস্বাস্থ্যের জন্য যেমন প্রয়োজনীয় তেমনি ভালো ঘুমের রয়েছে কিছু বিশেষ উপকারিতা। ভালো ঘুমের ফলে মানুষের শরীর ও মনের যে সমস্ত উপকার সাধন হয়ে থাকে তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

  • সারাদিনের কাজ কর্মের ফলে শরীরের মাংসপেশীর যে ক্ষয় হয়ে থাকে তা রাতের বেলা ঘুমানোর মাধ্যমে পূরণ হয়ে যায়
  • শরীর ও মনের ক্লান্তি দূর করে এবং পুনরায় কাজ করার সক্ষমতা তৈরি হয় অর্থাৎ মাংসপেশীতে পুনরায় শক্তি প্রাপ্তি ঘটে (Restore energy)
  • রাতের বেলা ঘুমানোর মাধ্যমে মস্তিষ্কে ভালো ভাবে স্মৃতি সংরক্ষণ হয়ে থাকে এবং মনোযোগ দেওয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়
  • হৃদপিন্ডের (Heart) কার্যক্ষমতা ভালো রাখে এবং রক্তচাপ (Blood Pressure) নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে
  • সার্বিক ভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity system) বৃদ্ধি করে ‌যা রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সুস্থ্য থাকতে সহায়তা করে

প্রতিদিন কত ঘন্টা ঘুমানো উচিত?

ঘুমের জন্য রয়েছে রাত তবে শুধুমাত্র রাত বললেই ঘুমানোর সময় সীমা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। আর তাই এই ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশন (NSF – National sleep foundation) এর রয়েছে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। বয়স অনুযায়ী ঘুমের সময়সীমাতে রয়েছে ভিন্নতা যা নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো। (Holland, 2019)

বয়স ঘুমানোর নির্দেশনা
৬৫ বা তার বেশি ৭ থেকে ৮ ঘন্টা
১৮ থেকে ৬৪ বছর ৭ থেকে ৯ ঘন্টা
১৪ থেকে ১৭ বছর ৮ থেকে ১০ ঘন্টা
৬ থেকে ১৩ বছর ৯ থেকে ১১ ঘন্টা

উপরের ছকে দেখা যাচ্ছে যে বয়সের সাথে সাথে ঘুমের পরিমাণ কমতে থাকে। তেমনি ভাবে একদম কম বয়সীদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঘুমানোর জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেমন:

বয়স ঘুমানোর নির্দেশনা
৩ থেকে ৫ বছর ১০ থেকে ১৩ ঘন্টা
১ থেকে ২ বছর ১১ থেকে ১৪ ঘন্টা
৪ থেকে ১১ মাস ১২ থেকে ১৫ ঘন্টা
৩ মাস বয়স পর্যন্ত ১৪ থেকে ১৭ ঘন্টা

বয়স ভেদে যেমন ঘুমানোর সময়সীমাতে ভিন্নতা রয়েছে তেমনি ভাবে আরো কিছু বিষয় রয়েছে যার উপর ঘুমানোর সময়সীমা নির্ভর করে। যেমন: পরিশ্রমের উপর নির্ভর করে ঘুমের তারতম্য রয়েছে।‌ যারা অধিক পরিমাণে পরিশ্রম করে থাকেন তাদের শরীরের মাংসপেশীর পুনরুদ্ধারের জন্য তুলনামূলক বেশি সময় ধরে ঘুমানোর প্রয়োজন পড়ে থাকে। আবার যাদের ক্ষেত্রে রাতে ঘুমের মধ্যে সহজেই ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার প্রবণতা কম রয়েছে তাদের বেলায় তুলনামূলক কম ঘুমানোই যথেষ্ট হবে।

ঘুম পর্যাপ্ত না হলে কি কি রোগ হতে পারে?

ঘুম পর্যাপ্ত না হলে কি কি রোগ হতে পারে

ব্যক্তি, বয়স, পরিশ্রমের ধরন ও ঘুমের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে ঘুমানোর সময়সীমা অনুযায়ী প্রত্যেকেরই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো উচিত। প্রয়োজনীয় সময়সীমার চেয়ে সামান্য কম/বেশি সময় ধরে ঘুমানোর ফলে খুব বেশি সমস্যা না‌ হলেও দীর্ঘদিন যাবত অপর্যাপ্ত ঘুমানোর ফলে শরীরের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে থাকে। ভালো ঘুমের যেমন অনেকগুলো উপকারিতা রয়েছে তেমনি পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো না হলে শরীর ও মনে নানাবিধ সমস্যা বা রোগ দেখা যেতে পারে।‌ যেমন:

  • দিন দিন স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে
  • মাংসপেশীর ক্ষয় হয় এবং কাজ করার সক্ষমতা কমে যায়
  • স্মৃতি শক্তি কমে যায় আর যার ফলে কোনো কিছু সহজেই ভুলে যায়
  • চিন্তা (Thinking) করার সক্ষমতা কমে যায়
  • কাজে মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়
  • অনিয়ন্ত্রিত রাগ ও আবেগ দেখা যায়
  • ত্বকের লাবণ্যতা কমে যায় এবং ব্রণ হতে দেখা যায়
  • যৌন সক্ষমতা কমে যায় ইত্যাদি

এছাড়াও কিছু জটিল রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায় যেমন ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ (উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক) শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। সার্বিক ভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় আর যার দরুন সহজেই ইনফেকশন ও রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়ে থাকে। (Holland, 2019)

ঘুমের ট্রিটমেন্ট (ঘুম না হওয়া বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা)

মানসিক চাপ (Stress), কাজের ব্যস্ততা ইত্যাদির কারণে কদাচিৎ ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে ‌তা রোগ হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে কিছু কিছু রোগ রয়েছে যা দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যার কারণ হতে পারে যাকে মেডিকেলের ভাষায় sleep disorders বলা হয়।‌ (Roddick,‌ 2020)

১. ইনসোমনিয়া (Insomnia)

সর্বাধিক প্রচলিত ঘুমের সমস্যা হলো ইনসোমনিয়া (insomnia) যা তুলনামূলক বয়স্ক মানুষ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে অধিক হারে দেখা যায়। মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, স্থান পরিবর্তন, হরমোনের প্রভাব, হজমের সমস্যা ইত্যাদি বিষয় গুলোকে ইনসোমনিয়ার কারণ হিসেবে মনে করা হয়। ইনসোমনিয়া সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন:

  • Chronic: একটানা এক মাস বা তার বেশি সময় ধরে ঘুমের সমস্যা হলে তাকে chronic insomnia বলা হয়
  • Intermittent: এটি হলো এমন এক অবস্থা যেখানে রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং পুনরায় ঘুম আসে না
  • Transient: একটানা অনেকদিন যাবত নয় বরং মাঝে মধ্যে ঘুমের সমস্যা হলে তাকে Transient insomnia বলা হয়

ইনসোমনিয়ার চিকিৎসা 

ইনসোমনিয়ার চিকিৎসা তার কারণের উপর নির্ভর করে অর্থাৎ যে কারণে ইনসোমনিয়া হয়েছে বলে বিবেচিত হবে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। যেমন:

  • থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা (Hyperthyroidism) জনিত কারণে ইনসোমনিয়া হলে সেক্ষেত্রে একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের কাছে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে
  • মহিলাদের মেনোপজের (Menopause) সময়ে শরীরে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে থাকে যার দরুন ইনসোমনিয়া হতে পারে। এহেন পরিস্থিতিতে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে
  • মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা কমাতে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে কাউন্সেলিং সেবা গ্রহণ করতে হবে
  • হজমের সমস্যা জনিত কারণে ইনসোমনিয়া হলে সেক্ষেত্রে হজম সহায়ক সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করতে হবে
  • এছাড়াও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঘুমের ওষুধ (sleeping pills) সেবন করা যেতে পারে

২. Sleep Apnea ও তার প্রতিকার

ইহা এমন একধরনের জটিল সমস্যা যেখানে ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায় আর যার দরুন ঘুম ভেঙ্গে উঠে পড়তে হয়। সাধারণত এটি দুই ধরনের হয়ে থাকে।‌ যথা:

  • Obstructive sleep apnea: শ্বাস-প্রশ্বাস চলাচলের রাস্তায় কোনো বাধার দরুন এই‌ সমস্যা হয়ে থাকে। যেমন: নাকের মধ্যে পলিপাস, টনসিল ফুলে যাওয়া ইত্যাদি। এহেন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শল্যচিকিৎসার (Surgery) মাধ্যমে বাঁধা (পলিপাস বা টনসিল) দূর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
  • Central sleep apnea: ইহা একধরনের জটিল স্নায়ুবিক সমস্যা যেখানে মস্তিষ্ক থেকে শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত মাংসপেশীতে যথাযথ সিগন্যাল পৌঁছে না। এই সমস্যার প্রতিকারে একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের (Neurosurgeon) পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

৩. Narcolepsy ও‌ তার প্রতিকার

খাওয়া কিংবা গাড়ি চালানো এমন যে কোনো পরিস্থিতিতেই হঠাৎ করে ঘুমিয়ে পড়া একধরনের রোগ যাকে Narcolepsy বলা হয়। এর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায় নি তবে জিনগত সমস্যা (Genetic problem), মাদকাসক্তি, রাত জাগা ইত্যাদির ফলে এই সমস্যা হতে পারে বলে মনে করেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। (Roddick, 2020)

এই সমস্যার প্রতিকারে মাদক সেবন পরিহার করা এবং অধিক রাত পর্যন্ত জেগে থাকার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। এছাড়াও প্রয়োজনে একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে।

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হয় যেনো কেউ জোর করে চেপে ধরে রেখেছে আর তা প্রতিহত করতে শরীরে কোনো শক্তি পাওয়া যাচ্ছে না এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই পড়েছেন হয়তো যাকে বোবায় ধরা বলে অভিহিত করা হয়। মূলত ইহা Narcolepsy এর সাথে সম্পর্কিত একধরনের রোগ যাকে মেডিকেলের ভাষায় sleep paralysis বলা হয়ে থাকে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তেমন কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেই তবে আশার কথা হলো এই যে এটি শরীরের জন্য তেমন কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না।

৪. Restless leg syndrome (RLS)

এই সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে পায়ে অস্বাভাবিক অনুভূতি হয় আর তখন দ্রুত পা সরানোর চেষ্টা করে থাকেন আর যার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে থাকে। এই‌ সমস্যার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি তবে এর সঙ্গে ADHD (attention deficit hyperactivity disorder) এবং Parkinson’s disease এর‌ সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে মনে করেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।

RLS এর চিকিৎসা 

RLS সমস্যা প্রতিকারে কতিপয় কার্যকরী উপায় হলো:

  • পায়ের পেশিতে ম্যাসাজ করা
  • নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা বা‌ দৌড়ানো অথবা সাঁতার কাটা
  • পায়ের পেশিতে গরম সেঁক অথবা বরফের প্রলেপ দেওয়া
  • চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পায়ের পেশিকে সুস্থির রাখার জন্য ওষুধ সেবন করা যেতে পারে

৫. Parasomnias

ঘুমের ঘোরে অবচেতন ভাবে অস্বাভাবিক আচরণ করলে তাকে মেডিকেলের ভাষায় Parasomnias বলা হয়। সাধারণত এক্ষেত্রে রোগী কিছুই টের পায় না কিন্তু তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে থাকে। এমনকি আশেপাশের মানুষদের জন্যও সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। Parasomnias নানা রকমের হয়। যেমন:

  • ঘুমের মধ্যে কথা বলা
  • ঘুমের ঘোরে উঠে অবচেতন ভাবে হাঁটাহাঁটি করা (Somnambulism)
  • দুঃস্বপ্ন দেখা এবং অস্বাভাবিক আওয়াজ বা কান্নাকাটি করা
  • বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলা
  • দাঁত দিয়ে চিবানোর মতো শব্দ করা

Parasomnias এর চিকিৎসা

দাঁত দিয়ে চিবানোর মতো শব্দ করা প্রতিকারে Dental guard ব্যবহার করা যেতে পারে। আর অন্যান্য সমস্যা গুলোর জন্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

রাতে ঘুম না আসার কারন ও প্রতিকার

সার্বিক ভাবে রাতে ঘুম না আসার কারণ হিসেবে sleep disorders এর পাশাপাশি আরো ‌কিছু বিষয়কে দায়ী করা যেতে পারে। যেমন:

  • সারাদিন শুয়ে অথবা বসে থাকা
  • চা, কফি, সিগারেট বা মদ্যপানের অভ্যাস
  • মাদকাসক্তি (Drug addiction)
  • রাতের বেলা ঘন ঘন ‌প্রস্রাবের বেগ হওয়া (Nocturia)
  • এলার্জি,‌ বাত ব্যথা বা মাথা ব্যথা
  • বিছানা, ঘরের তাপমাত্রা,‌ আলো ইত্যাদি ঘুমের জন্য আরামদায়ক না হওয়া
  • ঘরের মধ্যে অথবা ঘরের আশেপাশে বিরক্তিকর শব্দ
  • মশার উপদ্রব ইত্যাদি

বর্তমান‌ সময়ে ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার, মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি,‌ রাত জেগে মুভি দেখা ইত্যাদির ফলে অনেক মানুষের মধ্যেই রাতে দেরিতে ঘুমানোর প্রবণতা দেখা যায়। এই অভ্যাস পরবর্তী সময়ে রাতে ঘুম না আসার বা sleeping disorder এর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাতে ঘুম না আসা যেমন যন্ত্রণাদায়ক তেমনি শরীর ও মনের জন্য ক্ষতিকর। আর তাছাড়া রাতের বেলা ঘুম না পেলে রাত কাটানো কতটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন। রাতে ঘুম না আসার কারণগুলো দূরীকরণের মাধ্যমে খুব সহজেই এই সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। যেমন:

  • দিনের বেলা কায়িক পরিশ্রম করতে হবে
  • চা ও কফি পানের অভ্যাস কমাতে হবে
  • ধুমপান ও মদ্যপানের অভ্যাস পরিত্যাগ করা উচিত
  • এলার্জি ও‌ ব্যাথা নিরাময়ের জন্য ওষুধ সেবন করতে হবে
  • প্রস্রাব জনিত সমস্যা প্রতিকারে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে
  • ঘরের তাপমাত্রা, আলো ও বিছানা আরামদায়ক হতে হবে
  • মশারি টাঙিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করতে হবে
  • মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের আসক্তি কমাতে হবে

প্রয়োজনে ঘুমের ওষুধ (Sleeping pill) সেবন করা যেতে পারে। সাধারণত রাতে ঘুম না‌ আসা সমস্যার প্রতিকারে দুই ধরনের ওষুধ রয়েছে। যেমন:

১. OTC ওষুধ: OTC – over the counter শ্রেণিভুক্ত ওষুধ যা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই সেবন করা যেতে পারে।

  • diphenhydramine (Benadryl, Aleve PM)
  • doxylamine succinate (Unisom)

২. প্রেসক্রিপশন ওষুধ: এই ধরনের ওষুধ সমূহ অবশ্যই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী সেবন করা উচিত।

  • ramelteon (Rozerem)
  • temazepam (Restoril)
  • zaleplon (Sonata)
  • zolpidem (Ambien)
  • zolpidem extended release (Ambien CR)

এছাড়াও রাতে ঘুম না আসার প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য আরো কিছু করণীয় বিষয়াবলী হলো:

  • চিনি ও‌ শর্করা জাতীয় খাবার (Refined carbohydrates) কম খাওয়া উচিত
  • প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও মাছ খাওয়ার অভ্যাস করুন
  • নিয়মিত ব্যায়াম (Exercise) করুন
  • রাতের বেলা ‌তুলনামূলক কম পানি পান করুন
  • শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

ঘুমের ব্যায়াম

ঘুম না আসা সমস্যার প্রতিকার ও প্রতিরোধের জন্য ব্যায়ামের (Exercise) নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে এক্ষেত্রে কি ধরনের ব্যায়াম সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে? এবং সেই সাথে আরো জানার বিষয় হলো কতক্ষণ সময় ধরে ব্যায়াম করা উচিত এবং ‌কখন‌‌ ব্যায়াম করা উচিত?

গবেষণায় দেখা গেছে যে ব্যায়ামের ফলে অনিদ্রা (ঘুম না আসা) সমস্যা দূরীভূত হয়। (Pacheco, 2020) প্রায় সব ধরনের ব্যায়াম ই অনিদ্রা সমস্যা দূর করতে কার্যকরী হতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হলো মৃদু প্রকৃতির ব্যায়াম। যেমন:

  • হাঁটাহাঁটি করা (Walking)
  • সাঁতার কাটা (Swimming)
  • সিঁড়ি বেয়ে উঠা
  • বাইসাইকেল চালানো
  • নাচানাচি (Dancing) করা ইত্যাদি

ঘুমের সমস্যা প্রতিকারে প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে ব্যায়াম করাই যথেষ্ট। উল্লেখ্য রাতে ঘুমাতে যাওয়ার ১ ঘন্টা পূর্বে ব্যায়াম করা সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম। কারণ ব্যায়ামের সময় শরীরের তাপমাত্রা যেমন বেড়ে যায় আর তেমনি ভাবে ব্যায়াম শেষে শরীরের তাপমাত্রা কমতে থাকে যা সহজেই ঘুমিয়ে পড়তে সহায়তা করে। (Pacheco, 2020)

ঘুমের হরমোন

প্রাকৃতিক ভাবে শরীরের মধ্যে মেলাটোনিন (Melatonin) হরমোন উৎপাদন হয়ে থাকে যা ঘুমের জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। আর তাই এই‌ হরমোনকে Sleep hormone বলা হয়। (Holland, 2019) সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সাথে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণের সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ রাতের বেলা বেশি পরিমাণে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ হয়ে থাকে আর তাই রাত হলো ঘুমের জন্য শ্রেষ্ঠ সময়।

রাতে ঘুম না আসা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা মেলাটোনিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। মেলাটোনিন সাপ্লিমেন্ট ঘুম না আসা সমস্যা দূর করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে সক্ষম তবে এর কিছু ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। যেমন: মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ঝিমুনি (Dizziness) ইত্যাদি।‌

ভাল ঘুমের ৫টি টিপস

১। গবেষণায় দেখা গেছে যে সমস্ত মানুষ একেক দিন একেক সময় ঘুমাতে যান তাদের বেলায় প্রায়ই ঘুমের সমস্যা দেখা যায়। আর তাই প্রত্যেহ একই সময়ে (regular bedtime) ঘুমানোর অভ্যাস করা উচিত। এবং সেই সাথে সকালে ঘুম থেকে একই সময়ে উঠে পড়া জরুরি। (Mawer, 2020)

২। অনেকেই পোষা প্রাণী সাথে নিয়ে ঘুমাতে পছন্দ করেন কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে যে পোষা প্রাণী সাথে নিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার ফলে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। আর তাই রাতে ঘুমের সময় পোষা প্রাণী দূরে/অন্য ঘরে রাখা উচিত। (Holland, 2019)

৩। গবেষণা বলছে ঘুমাতে যাওয়ার ৬ ঘন্টা পূর্ব পর্যন্ত কফি (Caffeine) পান করা হলে তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। (Mawer, 2020) আর তাই সন্ধ্যার পরে কফি না খাওয়াই উত্তম।

৪। দিনের বেলায় আলোতে থাকা যেমন দেহের ছন্দ (circadian rhythm) ঠিক রাখতে সহায়তা করে তেমনি ভাবে রাতের‌ বেলায় আলোতে ঘুমানো ঘুমের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বিশেষত মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ থেকে নির্গত নীল আলো (Blue light) চোখের জন্য যেমন ক্ষতিকর তেমনি তা ঘুম না আসার কারণ হতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের ব্যবহার সীমিত করা উচিত বিশেষত রাতের বেলায়। এছাড়াও নীল আলো প্রতিরোধে সক্ষম চশমা (Blue cut lenses) ব্যবহার করা উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে। (Mawer, 2020)

৫। মদ্যপানের অভ্যাস পরিত্যাগ করা জরুরি।‌ কারণ গবেষণায় দেখা গেছে যে মদ্যপানের অভ্যাস মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। আর মেলাটোনিন হলো এমন একধরনের হরমোন যা ঘুমের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

বোনাস টিপস

  • বিছানা ও‌ বালিশ আরামদায়ক হতে হবে
  • ঘুমানোর পূর্বে ঢিলেঢালা বা আরামদায়ক পোশাক পরিধান করতে হবে
  • দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট পর্যন্ত ঘুমানো‌ মস্তিষ্কের জন্য উপকারী হতে পারে।‌ এর চেয়ে বেশি সময় ধরে দিনের বেলায় ঘুমানো উচিত নয়
  • রাতের খাবার অনেক দেরিতে খাওয়া উচিত নয়।‌ বরং ঘুমানোর ৩ থেকে ৪ ঘন্টা পূর্বে রাতের খাবার গ্রহণ করা উত্তম
  • ঘুমানোর ১ থেকে ২ ঘন্টা পূর্বে অনেক বেশি পরিমাণে পানি পান করা উচিত নয়। কারণ তা রাতে প্রস্রাবের বেগ তৈরি করতে পারে যা ভাল ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়
  • ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে কিছুক্ষণ সময় ধরে বই পড়া,‌ মৃদু শব্দে গান শোনা, যোগব্যায়াম (Yoga) করা ইত্যাদি ঘুমের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে

ঘুম মানুষের সুস্থতার জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি উপাদান যার অভাবে মানুষ খুব সহজেই শারীরিক ও মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। আর তাই প্রত্যেহ নিয়ম মাফিক পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো উচিত। সেই সাথে কারো ঘুমের সমস্যা হতে থাকলে প্রথমত ঘুম না আসার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। অতঃপর সেই কারণ অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও উপরে উল্লেখিত ঘুম বিষয়ক বিজ্ঞানসম্মত টিপস গুলো ঘুমের সমস্যা দূর করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।

 

 

 

References

Holland, K. (2019, July 03). What Do You Want to Know About Healthy Sleep? Retrieved from Healthline: healthline.com/health/healthy-sleep

Mawer, R. (2020, February 28). 17 Proven Tips to Sleep Better at Night. Retrieved from Healthline: healthline.com/nutrition/17-tips-to-sleep-better

Pacheco, D. (2020, December 11). Exercise and Insomnia. Retrieved from Sleep foundation: sleepfoundation.org/insomnia/exercise-and-insomnia

Roddick, J. (2020, July 28). Sleep disorders. Retrieved from Healthline:

healthline.com/health/sleep/disorders

 

Last Updated on March 2, 2022

Was this article helpful?
YesNo